ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

নিখোঁজ হলো ইলিয়াস আলী, লাভটা হলো কার? – (ক) জনগনের (খ) সরকারের (গ) বিরোধী দলের (ঘ) এদের কারোরই না।
এবার যদি আপনার মতে সঠিক উত্তরটির পাশে টিক চিহ্ন দিতে বলা হয় কোনটিতে দেবেন? মনে মনে টিক চিহ্নটি দিন, এখন দয়া করে লেখার বাকি অংশটুকু পড়ুন।

ইলিয়াস আলীর নিখোঁজের একটু আগে থেকে শুরু করতে চাই। আমরা দেখেছি বিভিন্ন ইস্যুতে বিরোধী দলগুলো বিশেষ করে প্রধান বিরোধী দল সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে আসছিলো। সেসব আন্দোলন ব্যপক ভাবে জোড়ালো হতে না পারলেও হঠাৎ করেই ইলিয়াস আলীর ইস্যুটি আসবার পর থেকে এখন পর্যন্ত বিরোধী দলের আন্দোলন যে ব্যপক ভাবে আলোচিত এবং গনমাধ্যমগুলোর দৃষ্টির কেন্দ্র বিন্দু তাতে কোন সন্দেহ নেই। শুধু তাই নয় দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলছেন বিদেশিরাও। ইলিয়াস আলীর নিখোঁজের অল্প কিছুদিন পরই দু`টি দেশের দুই জন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বাংলাদেশ সফর করে গিয়েছেন। দু`জনই দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। যাই হোক, এক নজরে সংক্ষেপে দেখে নিই ইলিয়াস আলী নিখোঁজের ইস্যুটি তৈরি হবার পর থেকে এটিকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে কি কি ঘটে চলেছে-

– একটি পরিবার (ইলিয়াস আলীর) তাদের স্বজনকে হারিয়ে ভয়াবহ যন্ত্রনা ভোগ করছে। তারা এটাও জানেনা তাদের পরিবারের সদস্যটি বেঁচে আছে কি নেই।
– দেশে তিন দিনের লাগাতার হরতাল হয়েছে।
– হরতালের আগে ও চলাকালীন সহিংস ঘটনা ঘটেছে। সাধারন খেটে খাওয়া মানুষ প্রান হারিয়েছে।
– জনগনের ভোগান্তি বেড়েছে। মানুষ আতঙ্কিত অবস্থায় রয়েছে।
– দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হয়েছে। যার প্রেক্ষিতে বিভিন্ন রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বক্তব্য এসেছে।
– বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়েছে।
– বিরোধী দলের কয়েকজন নেতা গ্রেপ্তার হয়েছে। অনেক নেতার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।
– আগাম জামিন আর গ্রেপ্তারী সম্ভবনা নিয়ে ব্যপক তোলপাড় হয়েছে।
– বিরোধী দলীয় নেতারা গ্রেপ্তারের আশংকায় কারাভোগের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
– বিরোধী দলের আন্দোলন অনবরত আলোচনায় এসেছে।
– টিভি চ্যানেলগুলোর সংবাদ শিরোনাম আর সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় গুরুত্বের সাথে এই সংক্রান্ত বিষয়ই প্রাধান্য পেয়েছে।
– সরকার দেশের ভিতরে এবং বাহিরে চাপে পরেছে।
– এই ইস্যু কেন্দ্রিক বর্তমান প্রেক্ষাপটে আনেক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু কম গুরুত্বের সাথে আলোচিত হচ্ছে।
– সরকার ও বিরোধী দল উভয়েই কাঁদা ছোঁড়াছুঁড়ির মত একে অন্যকে দোষারোপ আর হেয় করায় ব্যস্ত হয়েছে।

এখানে উল্লেখ করা ঘটনা গুলো থেকে কিছু বিষয় মনে হয় স্পষ্ট। যেমন-
(১) জনগনের কোনই লাভ হয়নি, হয়েছে কেবল ক্ষতি।
(২) বিরোধী দলের বক্তব্য অনুযায়ি সরকার যদি এ ঘটনা (ইলিয়াস আলীর গুম) ঘটিয়েও থাকে এতে সরকারের লাভ না হয়ে উল্টো ক্ষতিই হয়েছে। সরকার দেশের ভিতরে এবং বাহিরে চাপে পরেছে। সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগের তালিকায় আরো একটি বিষয় যুক্ত হয়েছে।
(৩) বিরোধী দল আন্দোলনের একটি শক্ত ইস্যু পেয়েছে। এটিকে কেন্দ্র করে দলীয় নেতা কর্মীকে আন্দোলনের জন্য উজ্জীবিত করার সুযোগ বেড়েছে। দেশে এবং দেশের বাইরে মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করতে পেরেছে। সরকারকে চাপে ফেলতে সমর্থ হয়েছে। সম্ভাব্য সুযোগ তৈরি হয়েছে, সরকারকে চাপে রেখে নির্বাচনের আগে প্রয়োজনীয় দাবি আদায় করার এবং আগামী নির্বাচনে তা কাজে লাগাবার। অন্যদিকে দলের একজন নেতা নিখোঁজ, কোন কোন নেতা গ্রেপ্তার এবং গুরুত্বপূর্ণ অনেক নেতারা গ্রেপ্তারের আশংকায় ভুগছে।

তাহলে আপাতদৃষ্টিতে দেখা যাচ্ছে ক্ষতির পাশাপাশি কিছু লাভ কিংবা লাভের সম্ভাবনা তৈরী হয়েছে মূলত বিরোধী দলেরই (এটি ঘটে চলা ঘটনার প্রেক্ষিতে আপাত মূল্যায়ন, ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি ভিন্ন হতেও পারে)। তবে তার মানে এই নয় যে বিরোধী দলই লাভের আশায় এমন ঘটনা ঘটিয়েছে। আমরা সরকারের কাছে যেমন আশা করিনা যে তারা এ ঘটনা ঘটিয়ে দেশকে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিবে আবার বিরোধী দলের কাছেও আশা করিনা যে তারা আন্দোলনের ইস্যু তৈরির জন্য এমনটা ঘটিয়ে থাকবে। যদিও সরকারী দল আর বিরোধী দলের কাঁদা ছোঁড়াছুঁড়ি চলছেই, কিন্তু আমরা নিশ্চয়ই চাই না নিশ্চিত না হয়ে কাউকে এ ঘটনার জন্য দায়ী বলতে। তবে আমরা যেটা চাই তা হচ্ছে এই ঘটনার সত্য উদ্ঘাটন এবং শান্তিপূর্ণ সমাধান। প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন ছাড়া এই লেখার শুরুতে যে প্রশ্ন করা হয়েছিল তার সঠিক উত্তর দেয়া সম্ভব নয়। বিতর্ক অনেক হতে পারে, ভিন্ন ভিন্ন মত থাকতে পারে, কিন্তু প্রকৃত সত্যটির মাঝেই আছে এর সঠিক উত্তর। এই ঘটনার সত্য উদ্ঘাটনে সরকার যদি উদাসীন থাকে দেশের জনগন যেমন তা ভাল ভাবে নিবে না, তেমনি বিরোধী দল যদি এই ইস্যুকে ব্যবহার করে জনগনকে হয়রানি করে রাজনৈতিক সুবিধা নিতে চায় সেটাও জনগন ভাল ভাবে নিবে না। তাই রাজনৈতিক দলগুলোর মনে রাখা উচিৎ, জনগনের নীরব দৃষ্টি তাদের উপর সবসময়ই রয়েছে। আর জনগনের এই নীরব দৃষ্টি সব সময় যেন সজাগ আর সতর্ক থাকে সেই প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা আমাদের সকলেরই দায়িত্ব।