ক্যাটেগরিঃ নাগরিক আলাপ

এইতো কয়েকদিন আগের কথা। লোডশেডিং চলছে তাই বারান্দায় একটু বাতাসের আশায় বসে আছি। সাথে আমার স্ত্রী আর মেয়ে। হঠাৎ করেই আমার মেয়েটা আবাক আর বিস্ময়ের সাথে বলে উঠলো, দেখো দেখো জোনাকী! তাকিয়ে দেখলাম একটা জোনাকী আমাদের খুব কাছেই। আমার মেয়ে খুব খুশি কারন জোনাকীটা তার দিকেই আসছে। আবছা আধারে জোনাকীর আলো জলতে নিভতে দেখে আমিও মুগ্ধ হলাম। কিন্তু হঠাৎই জোনাকীটা দিক বদল করে আমাদের সামনে দিয়েই অন্যদিকে উড়ে চললো। মেয়েটার মনটা একটু খারাপ হয়ে গেলো। তারপর মন খারাপ করেই তাকিয়ে থাকলো জোনাকীটা দৃষ্টির আড়াল হওয়া পর্যন্ত।

একটা বিষয় বলা হয়নি। আমি কিন্তু ঢাকাতেই থাকি। ঢাকার একটি জনবহুল এলাকায় আমার বসবাস। আগের বাসা বদল করে এই মাসেই একই এলাকার এই বাড়িটিতে উঠেছি। আপনারা ভাবছেন ঢাকা শহরে জনবহুল এলাকায় জোনাকী পোকা! এটাও কি সম্ভব? আমি নিজেও একটু অবাক হয়েছিলাম। আসলে এই বাড়িটির ঠিক সামনের দু`টি প্লটে এখনো একতলা দু`টি বাড়ি আর বেশ কিছু গাছ আছে। তাই দালান-কোঠার ভিরে এক টুকরো সবুজ এখানটায় টিকে আছে। তাকালে একটা গ্রামের ছোয়াঁ পাওয়া যায়। তবে খুব শিঘ্রীই এই সবুজটুকু হারিয়ে যাবে কারন ঐ বাড়িটির সামনে ইতিমধ্যেই বিল্ডার্সের সাইন বোর্ড শোভা পাচ্ছে! অর্থাৎ হারিয়ে যাবে এই সবুজ! হারিয়ে যাবে এই জোনাকীও!

এই সবুজের হারিয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় শহরগুলো সবচেয়ে এগিয়ে। অবশ্য গ্রামগুলোও পিছিয়ে থাকছে না। নতুন নতুন ইটের ভাটা, কারখানা আর যত্র তত্র বসত-বাড়ি গ্রাস করছে প্রকৃতিকে। আর ডেভেলপার কম্পানীগুলোর দাপটে শহর এলাকার আকাশ ছোট হচ্ছে ভয়াবহ হারে।

ঢাকায় অবস্থিত একটি আবাসিক প্রকল্পের বিঙ্ঙাপন চিত্রে দেখানো হয়, ঢাকা শহরের মধ্যেও তাদের আবাসিক এলাকায় এখনও আনেক জোনাকী পোকা দেখা যায়। পাওয়া যায় সবুজের ছোঁয়া। জানিনা এই চিত্র বাস্তবে কতদিন থাকবে। আমার জানা মতে মালয়শিয়ায় একটা নিয়ম ছিলো (হয়তো এখনো আছে) যে, প্রত্যক বাড়ির সামনেই গাছ থাকতে হবে। যদিও সে দেশের বেশীরভাগ এলাকা জুড়েই পাহাড় এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর তবুও কত চমৎকার ব্যবস্থা কিন্তু আমাদের দেশে প্রয়োজনের তুলনায় বনান্চল যেখানে খুবই কম তবুও এখানে এমন কোন নিয়ম আমরা দেখতে পাই না।

একবার ভেবে দেখুনতো যদি প্রতিটি বাড়ির সামনে দু`টি করে গাছ থাকতো তাহলে আপনার এলাকায় কতগুলো গাছ থাকতো? তাহলে হয়তো সকালে আপনার ঘুম ভাংতো পাখীদের গানে, লোডশেডিংয়ে আপনি যখন অসহ্য হয়তো কোন জোনাকী আপনার জানালা দিয়ে ঘরে চলে আসতো। দেখতেন ঐটুকু আলোই আপনার মনকে কতটা আলোকিত করছে। আপনার ঘরের ছোট্ট শিশুটি কতনা আগ্রহে জোনাকীর সাথে খেলায় মেতে উঠেছে।

কেউ কেউ হয়তো বলবেন, এসব কথা লেখালেখিতেই মানায় বাস্তব চিন্তাটা হলো পাঁচ কাঠা প্লটে কয় তলা বাড়ি আর কতগুলো ফ্ল্যাট করা যায়। আর তা থেকে কত আয় করা সম্ভব। পকেটে যখন পয়সা থাকবে প্রকৃতির ছোঁয়া কোন দুরহ ব্যপার হবে না।

এ কথা ঠিক যে পয়সা খরচ করে বছরে হয়তো এক দু`বার প্রকৃতির কাছে অনেকেই যান কিন্তু পয়সা খরচ করে প্রকৃতির কাছে যাওয়া আর প্রকৃতির মাঝে বাঁচা এ দুইয়ের মাঝে পার্থক্যটা বিশাল। তাই আর্থের পাশপাশি প্রকৃতির বিষয়টিও সকল পর্যায়ের মানুষ যদি একটু সুবিবেচনা করেন তাহলে এর সুফল ভোগ করবেন আপনি, আমি এবং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।