ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

শিক্ষাঙ্গনের ছাত্রদের নিরাপত্তা নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠছে। সাথে সাথে এর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন বিশিষ্ট জনেরাও। সবার প্রশ্ন একটাই এর শেষ কোথায়। বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনের বর্তমান প্রেক্ষিতে ছাত্র হত্যা একটি নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহনের পর থেকে শিক্ষাঙ্গনের নৈরাজ্য ব্যাপক হারে বেড়ে গেছে। ছাত্রদের যেখানে লেখাপড়া নিয়ে ব্যস্ত থাকার কথা ছিল সেখানে আজ তাদের নিরাপত্তার প্রশ্ন দেখা দিয়েছে অনেক বড় ভাবে। সাথে সাথে প্রশ্ন উঠেছে শিক্ষাঙ্গনে ছাত্ররাজনীতি থাকবে কিনা। বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগে ও পরে যতগুলো সফল আন্দোলন তার পেছনে কাজ করেছে ছাত্র আন্দোলন। যেখান থেকে জাতীয় রাজনীতিতে অবদান রেখে চলেছেন অনেকে। দেশকে নেতৃত্ব দিয়েছেন সামনে থেকে।

কিন্তু আজ আবারও প্রশ্ন উঠেছে শিক্ষাঙ্গনে যে নৈরাজ্য তা কি বন্ধ হবার নয় বা যারা হত্যার শিকার হলেন তাদের পরিবারের কি হবে। আবার বিচারই বা কি হবে। বিচার হলে হয়তোবা অপরাধীরা জেল বা ফাঁসি হবে। কিন্তু যে ছাত্রটি বারটি বছর পার করে উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা নিতে এসে লাশ হয়ে মা বাবার কোলে ফিরে যাচ্ছে এর দায় নিবে কে?

বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহনের পর থেকে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যতগুলো ছাত্র সংঘর্ষের ঘটনায় নিহত হয়েছে তার বেশীর ভাগই ঘটেছে ক্ষমতাসীন ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীন কোন্দল,প্রতিপক্ষ গ্রুপের উপর হামলা ছিল অন্যতম আলোচিত ঘটনা। যেখানে খুন, হত্যা, ধর্ষণ, রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, গোলাগুলি, বোমাবাজি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, ইভটিজিং,ব্যবসা, শিক্ষক ও সাংবাদিক লাঞ্ছনা-নির্যাতন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলা,ভর্তি বাণিজ্য ঘটনা ছিল প্রায় নিত্যদিনের । বড় আকারের সংঘর্ষ হয়েছে, এমন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়,জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়,জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট),কবি নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়, শেরে-ই-বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় বিশেষভাবে বিভিন্ন সময়ে পত্রিকার পাতায় আলোচিত ছিল।

তিন বছরে ছাত্রলীগের সঙ্গে প্রতিপক্ষ ছাত্রদল, ছাত্র শিবির, বাম ছাত্র সংগঠন ও সাধারণ ছাত্রদের মধ্যে ছোট-বড় ২০০টি সংঘর্ষ ও হামলা হয়েছে। খুন হয়েছে ছাত্রলীগ,ছাত্রদল, শিবির, বাম ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মী ও সাধারণ ছাত্র। সরকারের তিনবছরে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হত্যার শিকার হয়েছেন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থী।। এরা ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, শিবির, বাম সংগঠন ও সাধারণ ছাত্র। নিহতের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১০ সালের ২ ফেব্রুয়ারি এফ রহমান হলে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে খুন হন ইসলামের ইতিহাস বিভাগের মেধাবী ছাত্র আবু বকর, ২০০৯ সালের ৩১ মার্চ ঢাকা মেডিকেল কলেজে ছাত্রলীগের দু গ্রুপের সংঘর্ষে নিহত হন মেডিকেল কলেজ ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ (রাজীব),রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০৯ সালের ১৩ মার্চ ছাত্রলীগ-শিবির সংঘর্ষে নিহত হয় ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিবিরের সাধারণ সম্পাদক শরীফুজ্জামান নোমানী,২০১০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ছাত্রলীগ-শিবির সংঘর্ষে নিহত হয় ছাত্রলীগ কর্মী ফারুক হোসেন। একই বছর ১৫ আগস্ট শোক দিবসের টোকেন ভাগাভাগিকে কেন্দ্র করে শাহ মখদুম হলের দোতলার ছাদ থেকে ছাত্রলীগ কর্মী নাসিমকে ফেলে দেয় ছাত্রলীগের সভাপতি গ্রুপের কর্মীরা। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৩ আগস্ট নাসিমের মৃত্যু হয়। ৭ জানুয়ারি রাজশাহী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ছাত্রমৈত্রীর সহ-সভাপতি রেজানুল ইসলাম চৌধুরীকে খুন করে ছাত্রলীগ,২০১০ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ১১ ফেব্রুয়ারি রাতে চট্টগ্রাম রেলস্টেশনে চবি রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র মহিউদ্দিনকে কুপিয়ে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। এর দেড় মাস পর ২০১০ সালের ২৮ মার্চ রাতে শাটল ট্রেনে করে শহর হতে ক্যাম্পাসে ফেরার পথে চবি মার্কেটিং বিভাগের ছাত্র হারুন অর রশীদ কায়সারকে হত্যার শিকার হন চট্টগ্রাম নগরীর চৌধুরীহাট এলাকায়, ১৫ এপ্রিল চবি ছাত্রলীগ ও বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন জোবরা গ্রামবাসীর মধ্যে সংঘর্ষে একাউন্টিং দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আসাদুজ্জামান নিহত হয়, ২০১০ সালের ১২ জুলাই সিলেট এমসি কলেজে ছাত্রলীগের এক পক্ষের হামলায় অপরপক্ষের কর্মী পলাশ খুন হয়, ২০১১ সালের ২০ অক্টোবর ছাত্রলীগের নির্মম নির্যাতনে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ছাত্রদল নেতা বিডিএস চতুর্থ বর্ষের ছাত্র আবিদুর রহমান নিহত হয়। সাম্প্রতিক সময়ে ছাত্রহত্যার ঘটনার মধ্যে অন্যতম আলোচিত ছিল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র জুবায়ের আহমেদ হত্যার ঘটনা। বছরের শুরুতে ৮ জানুয়ারী স্নাতক চুড়ান্ত পর্বের শেষ পরীক্ষা দিয়ে বের হলে পূর্বশত্রুতার আক্রোশে তাকে ডেকে নিয়ে নিজ সংগঠনের অন্য গ্রুপের কর্মীরা ব্যাপক মারধর করে। পরদিন সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জুবায়েরের মৃত্যু হয়। ফেব্রুয়ারী মাসেই আবার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ ও ছাত্রশিবিরের সংঘর্ষে দুজন শিবির কর্মীর মৃত্যু হয়। সর্বশেষ নিহত হয় রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র আব্দুল আজিজ। সে বিশ্ববিদ্যালয়ের হল শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক ছিল। এভাবে আর কতো শিক্ষার্থী জীবনের নিরাপত্তার অভাবে উচ্চ শিক্ষা নিতে এসে লাশ হয়ে ফিরে যাবে। সরকারের উচিত বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস গুলোতে সকল দলের সহাবস্থান নিশ্চিত করে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ক্যাম্পাসে স্থিতিবস্থা বজায় রাখা।