ক্যাটেগরিঃ চারপাশে

কাটাবন যাব। দয়াগঞ্জ থেকে ১৩ নাম্বারে উঠলাম। গাড়ি চলছে। জয়কালি মন্দির এসে থামল। শুনলাম শেয়ার বাজারে আগুন। মানে শেয়ারে আগুন জ্বলছে। শেয়ার নেমে যাওয়ার কারণে। এখন নিয়মিতই যেটা হয়। আমাদের গাড়ি মতিঝিল গেল না। মতিঝিলের যাত্রীদের ওখানেই নামতে বলল। কেউ কেউ নামল। কেউ নামল না। পরে বঙ্গভবনের পাশ দিয়ে বাস মতিঝিল ছুটল। মতিঝিলের বেশ কিছু যাত্রী আছে। কয়েকজন যাত্রী নিষেধ করল। বললো বালাদেশ ব্যাংকের সামনে আগুন। ওদিক দিয়ে বের হওয়া যাবে না। মাঝপথে এসে ড্রাইভার থামল না। ছুঠে চললো। সোনালি ব্যাংকের সামনে এসে দেখল চরম অবস্থা! গাড়ি নড়ানোও সম্ভব না। পিছনে ফিরতে হবে। কোন মতে পিছনে ছাইড নেয়ার চেষ্টা করছে। হঠাৎ পিছনের রিকশায় “টাস” লাগে। রিকশারোহীর উরুতে সামান্ন (বড়ই সামান্ন) আঘাত লাগে। ব্যথা পায়। কেটে যায়নি। কারণ রক্ত বের হচ্ছে না। তেমন আঘাতও মনে হয় না। লোকটি আমাদের বাসে উঠল। আমরা এতটুকু স্বাভাবিকভাবেই লক্ষ্য করলাম।

০২. লোকটা ড্রাইভারের পিছনে বসল। বলল আমাকে মেরে ফেলেছিস। চালক চুপচাপ। কিছু বলছে না। লোকটি বলছে তোকে দেখাচ্ছি দাড়া। ড্রাইভার তখনো নিশ্চুপ। আমাদের গাড়ি পল্টন মোরে আসতেই লোকটি ড্রাইভারের মাথায় ধুমধাম ঘুষি। বেশ কয়েকটি ঘুষি। লাত্থিও দিচ্ছে। সাথে সাথে মোবাইলে বলছে আয়। তাড়াতাড়ি আয়। কয়েকজন লোক দৌড়ে এলো। ড্রেস আপে চরম অভদ্র। মনে হলো এরা এখানকার মাস্তানদের চাকর শিষ্য হবে। আমরা মাত্র ৮/১০ জন যাত্রী। কেউ কিছু বলছে না। বলতে পারছে না। কিছু বলে উঠলাম। কিন্তু অভাগা যে একা। কী করব? ওরা (মাস্তানরা) বলল আপনারা নেমে যান। আমরা নামতে নামতেই ড্রাইভারকে কলার ধরে নামিয়ে ফেলল। ভীষণ মার। লাথ্থি, ঘুষি, চড়-থাপ্পর যে যেভাবে পারে। ও কাঁদছে। হাউমাউ করছে। আমি কী করব বুঝতে পারছি না। একা তো। কয়েকজন হলেও অন্তত ওদের থামানো যেত। বলা যেত দেখি সমাধান করা যায় কিনা। কিন্তু কিছুই করা সম্ভব না। ওকে মাস্তানরা টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যেতে লাগল। সাথে সাথে সে কী লাথ্থি। হাউমাউ করে কাঁদছে। আর বলছে “ভাই মারলে কী হবে? ভুল তো হয়েই গেছে”। ওরা বলছে “তোকে জানে বাঁচতে দিব না”। ড্রাইভার বললো “ভাই আমি গাড়ি চালাইয়া বাচিঁ। আমাকে মারলে কী লাভ?”

০৩. আমারও মন খারাপ হয়ে গেল। ভীষণ খারাপ। এভাবে গরিব দুখীর কান্না দেখা যায়? বললাম “ভাই একে মারলে কী হবে। মালিককে খবর দিতে পারেন”। ওরা অমানুষ। তেলে বেগুনে তেড়ে ওঠে। ভাগ্যিস আসি একা। ভার্সিটিরর বন্ধুরা থাকলে এত অত্যচার সহ্য হত না। আর যাইহোক অন্তত ড্রাইভারকে এভাবে মারতে দিতাম না। কী করি? মাথায় কিছু খেলছে না। কী করুণ কান্না! হেলপারকে বলি দৌঁড়ে পুলিশ খবর দাও। ওকে মোড়ের পুলিশ দেখিয়ে ইঙ্গিত করলাম। ও দৌড়ে গেল। পুলিশ হাজির। বড়জোড় দু’মিনিট। (এখন ভাবছি এত সহজে-দ্রুত আমেরিকাও পুলিশ আসে কিনা?) পুলিশ এসে ড্রাইভারকে উদ্ধার করলো। হেলপারের মুখ দেখে বুঝা গেল ওরা ক্ষুধার্ত-হিংস্র বাঘের থেকে মুক্তি পেয়েছে। আমিও কেটে পড়লাম। ভাবলাম একী সভ্য সমাজে হতে পারে? এও সম্ভব? (!) হাঁটছি….। আমার পায়ের শক্তি ফুরিয়ে আসছে। অজান্তেই চোখ ভিজে উঠছে। মনে পড়ল কবি নজরুলের সেই কুলি-মজুর। কুলি-মজুর কবিতার লাইন।

“সেদিন দেখিনু রেলে,
কুলি বলে এক বাবুসাব তারে ঠেলে দিল নিচে ফেলে।
চোখ ফেটে এল জল,
এমন করে কি জগৎ জুড়িয়া মার খাবে দুর্বল?”