ক্যাটেগরিঃ দিবস প্রসঙ্গ

 

আজ বারো জুন, বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মত বাংলাদেশেও পালিত হবে এই দিবসটি। এ বছরের এই দিবসের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হল “মানবাধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচার: আসুন শিশুশ্রম নিরসন করি”..পাঠক আসুন আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে দেখে নেই এই দিবস ও তার প্রতিপাদ্যের বর্তমান এবং ভবিষ্যত।

উল্লেক্ষ্য যে, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আই, এল, ও) মতে আঠারো বছর পর্যন্ত সপ্তাহে তিতাল্লিশ ঘন্টার বেশি আয় রোজগারমূলক কাজ করাকে শিশুশ্রম বলা হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে চৌদ্দ বছরের নিচে যাদের বয়স তাদের আয় রোজগারের জন্য কাজ করা আই এল ও র মতে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। যদিও আমাদের দেশে মোট জনসংখ্যার কত ভাগ শিশু বিভিন্ন শ্রমে নিয়োজিত আছে এমন কোনও সাম্প্রতিক তথ্য সরকারী পরিসখ্যনে নেই, তবে এটা সহজেই অনুমেয় যে বাংলাদেশে শিশুশ্রমিকের বর্তমান সংখ্যা কয়েক লাখ ছড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব নয়। কিন্তু প্রশ্ন হল আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে শিশুশ্রম প্রতিরোধ আইন কতখানি প্রযোজ্য এবং তা কতখানি পালিত হচ্ছে?

দরিদ্রক্লিষ্ট আমাদের দেশে শিশুশ্রমিক তৈরি হয় মূলত দারিদ্রের কল্যাণে। পরিবারে অধিক সদস্যসংখ্যা, পিতা/মাতার অসুস্থতা, ভরণপশনে অক্ষমতা, খাদ্যমূল্যের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ছাড়াও আরও অসংখ্য কারণ আছে যা শিশুদের অনিচ্ছা সত্বেও ঠেলে দেয় সামান্যতম রোজগারের পথে। নিজে এবং নিজের পরিবারের মুখে সামান্য খাবার জুটাতে এই শিশুরা বেছে নেয় বিভিন্ন ঝুকিপূর্ণ কাজ। দেখা যায় যে গ্রামাঞ্চলে শিশুরা মূলত কৃষিজমিতে কাজ করা, ইটের ভাটা, মাটি কাটা, মাছ ধরা, নৌকা বাওয়া, হাটের দোকানে কাজ করা ছাড়াও নানা ধরনের কাজ করে থাকে। শহরে মূলত বাসাবাড়ির কাজ, পোশাক তৈরি কারখানা, হোটেলে ছাড়াও বিভিন্নধরনের ঝুকিপূর্ণ শিল্প কারখানায় কাজ করে থাকে। বলাবাহুল্য যে এসব শিশু শ্রমিক উদযাস্ত কাজ করে নামে মাত্র পারিশ্রমিকে। এছাড়াও ভিক্ষাবৃত্তি, ব্যস্ত রাস্তায় ফেরি করে জিনিস বিক্রি এমনকি পতিতালয়েও অনেক শিশু কাজ করে থাকে।

যে বয়সে একটি শিশুর বই নিয়ে স্কুল এ যাওয়ার কথা সে বয়সে সেই শিশুটি হয়তো কোনও হোটেলে বা বাসাবাড়িতে থালাবাসন পরিষ্কার করছে কিংবা তপ্ত রাস্তায় একটি মাত্র ফুল বেচার জন্য কোনও একটা চলন্ত গাড়ির পিছনে ছুটছে। যে শিশুটির মাযের কোলে বসে রূপকথার গল্প শোনার কথা, সেই শিশুটি গৃহকত্রীর ছোট মেয়েটির ক্লিপ খুজে পাচ্ছেনা অপরাধে গরম খুন্তির ছ্যাকা খেয়ে নীরবে কাদছে। এরকম আর ও অসংখ্য চিত্র আমাদের চোখের সামনেই অহরহ ঘটে যাচ্ছে।

কিন্তু কাজ না করেও বা এই শিশুদের উপায় কী? আইন করে শিশুদের কাজ থেকে প্রতিরোধ করাই কী এর সমাধান? ধরা যাক বারো বছরের যে মেয়েটি গার্মেন্টস এ কাজ করতো, সেই হল তার সাত সদস্যের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। এখন কোনরকম পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করে শিশু আইনের আওতায় এনে যদি মেয়েটিকে চাকুরী থেকে ছাটাই করা হয় তবে তার এবং তার পরিবারের ভবিষ্যত কী হবে? অন্য কোথাও বাড়ন্ত বয়সের মেয়েটি চাকুরী না পেয়ে হয়তো বাধ্য হয়ে ঠাই নেবে কোনও পতিতালয়ে..তার পরিবারের অন্য ভাইবোনেরও চলে যাবে অন্ধকার কোনও জগতে।

কিন্তু পাঠক এর মানে অবশ্যই এই নয় যে, শিশুশ্রমকে প্রশ্রয় দেয়া হোক। শিশুশ্রম বন্ধের জন্য অবশ্যই দরকার সঠিক এবং দীর্ঘমেয়াদী সরকারী পরিকল্পনা প্রণয়ন। ভাগ্যবঞ্চিত এই সব শিশুদের জন্য নির্দিষ্ট বাজেট প্রণয়ন এবং তা সঠিক বাস্তবায়ন। এছাড়া অবশ্যই পরিবার ছোট রাখা জরুরী। এক্ষেত্রে সরকার এবং বিভিন্ন এনজিওর জনসচেতনতামূলক কর্মসূচী অবশ্যই উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে।দরিদ্র পরিবারের বাবা/মা কে স্বাবলম্বী করার উদ্যোগ সরকারকে নিতে হবে। তবে অবশ্যই তা উচ্চ সুদের ঋণের বেড়াজালে জড়িয়ে নয়। বাবা/মা এর অর্থ উপার্জনের ক্ষমতা থাকলে শিশুশ্রম বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা দ্রুততর হয়। সরকার এবং এনজিওর পাশাপাশি আমাদের সাধারণ জনগণকেও এগিয়ে আসতে হবে। অন্তত একটি শিশুকেও যদি শিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে পারি কিংবা তাদের কর্মক্ষম পিতা/মাতা কে উপার্জনের জন্য কিছুটা হলেও সাহায্য করতে পারি, তবেই কিছুটা হলেও শিশুশ্রম বন্ধ সম্ভব হবে।

পাঠক, জানিনা কবে দেখবো,, রাস্তায় দাড়ান ন্যাংটা শিশুটি গায়ে জামা লাগিয়ে হাসিমুখে স্কুল এ যাচ্ছে, বাসায় গিয়ে তরকারি না পাক কিন্তু নুন দিয়ে হলেও এক থালা ভাত খেয়ে পেট পুড়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুলে মাঠে খেলতে যাচ্ছে!!! খুব কী অসম্ভব?

ছবি সুত্র : ডেইলি স্টার, ইন্টারনেট এডিশন থেকে প্রাপ্ত