ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 

বেশ কিছুদিন ধরে সংবাদপত্রে রোহিঙ্গা সমস্যার পাশাপাশি আশুলিয়াতে মালিক-শ্রমিক সংঘর্ষের খবর বেশ গুরুত্ব সহকারে প্রকাশ হচ্ছে। দু:খজনক হলেও সত্যি যে বিডি ব্লগে আশুলিয়া সমস্যার আশু সমাধান লক্ষ্যে আমাদের ব্লগারদের তেমন সোচ্চার হতে দেখছি না। আমরা যুক্তি তর্কে মেতে আছি রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে। এই ইস্যু নিয়ে ব্লগারদের মধ্যে রাজনীতিবিদদের মতই কাদা ছোড়াছুড়ি দেখেছি, দেখেছি ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি, নিজেদের মধ্য বিভক্তি, এমনকি গোয়েন্দাদের মত একে অপরের খবর সংগ্রহ করে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও। বাদ যায়নি কিছুই। কিন্তু দেশের মধ্যে চলমান আশুলিয়া সমস্যা নিয়ে আমরা কতখানি সচেতন? তাই সম্মানিত ব্লগার আসুন আমরা কথা বলি আপাত দৃষ্টিতে সামান্য (!) কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই ইস্যু নিয়ে।

আমরা কম বেশি সবাই জানি যে, পোশাক শিল্পে মালিক-শ্রমিক সংঘর্ষ একদিনের সৃষ্ট কোনও ঘটনা নয়। এর কারণ অনুসন্ধানে যে বিষয় গুলো আলোচনায় আসে তা হল, মূল্যস্ফীতির সাথে সময়মতো বেতন-ভাতার সমন্বয় না করা, কোনও নিয়ম ব্যতিরেকে ইচ্ছামাফিক শ্রমিক ছাঁটাই, শ্রমিকদের পিসরেট বাড়ানোর দাবি , শ্রমিকদের সঙ্গে কর্মকর্তাদের অসদাচরণ , এমনকি তাদেরকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার ঘটনা ঘটে থাকে। দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অসন্তোষ থেকেই শ্রমিকদের আমরা মাঝে মধ্যে দাবি আদায়ের লক্ষ্যে ফুসে উঠতে দেখি। শতাধিক আহত, বেশ কিছু নিহত হবার ঘটনা পত্র পত্রিকার পাতায় পড়ি। এরপর মালিকপক্ষের আংশিক দাবি মেটানোর আশ্বাস..এবং তারপর সব চুপচাপ। আদৌ তাদের দাবি মেনে নেয়া হয় কী না কিংবা আন্দোলনরত সেই সব শ্রমিকদের পরিণতি কী হয় আমরা তা কেউ জানি না, এবং খোজ রাখার প্রয়োজনও মনে করি না। এসব তুচ্ছ বিষয় নিয়ে মাথা ঘামনোর মত সময় আমাদের যেমন নেই, আমাদের অতি ব্যস্ত সরকারের তো আর ও নেই। যথারীতি মালিকপক্ষ আর সরকার হয়ে যায় এক দলে, দুর্বল শ্রমিকরা যাতে মাথা উচু করে কোনও দাবি জানতে না পারে এই জন্য সরকারের সাথে হয় শলা পরামর্শ।

সম্প্রতি ঘটে যাওয়া আশুলিয়া সংঘর্ষেও ঠিক একি চিত্র আমরা দেখতে পাচ্ছি। এবার মালিকপক্ষ যেন ইস্পাত কঠিন। উত্পাদন খরচ এত বেড়ে গেছে যে তাদের নাকি আর এই ব্যবসায় তেমন লাভ হচ্ছে না!!! কাজেই কারখানা বন্ধ করে দেবে, তবুও শ্রমিকদের বেতন তারা বাড়বে না। আমাদের রাজনীতিবিদদের কথার কোনও ঠিক না থাকলেও গার্মেন্টস মালিকরা কিন্তু এক কথার মানুষ। যেমন কথা তেমন কাজ। কাল থেকে তাই নিজেদের রুজি রোজগার বন্ধ করে তারা নিজের বাসার সুইমিং পূলে সাতার কাটবেন কিংবা রুপসী বাংলাতে গিয়ে রুপসী নারীর পাশে বসে ব্যবসা ভাল যাচ্ছে না এই দুক্ষে রঙিন পানীয় পান করে মন ভাল করার চেষ্টা করবেন। কিন্তু কারখানা চালু করবেন না। এইসব বদমাশ ছোটলোক শ্রমিকদের কিভাবে শায়েস্তা করতে হয় তারা তা ভালোভাবেই জানেন। আর একবার ওদের জন্মের মত শিক্ষা দিলে জীবনের তরে আন্দোলন কী এবং কাকে বলে তারা তা বুঝিয়ে দিতে পারবে। মন্দার এই স্রোতে মালিক পক্ষ আর কী বা করতে পারে বলুন। বহু কষ্টে তারা আছে, দিন চলছে বলে মনে হয় না।

কিন্তু কারখানা বন্ধ করে দেয়াই কী দীর্ঘদিনের তিলে তিলে গড়ে ওঠা এই সমস্যার সমাধান? এর সাথে জড়িয়ে থাকা এতগুলো লোকের আয়ের উত্স বন্ধ করে মালিক পক্ষ যে জনস্বার্থ বিরোধী সিদ্ধান্ত নিয়েছে তার আশু সমাধান করা সরকারের জন্য রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে চিন্তা করার চেয়েও অনেক গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে হয়। কারণ, পোশাক শিল্প আমাদের দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের রপ্তানি আয়ের সিংহভাগই আসে এই শিল্প থেকে। কাজেই এই শিল্পের সাথে জড়িত আমাদের শ্রমিকরা অবশ্যই দেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক, যাদের ন্যায্য দাবির পাশে আমাদের একাত্মতা অত্যন্ত জরুরী।

পাঠক, এখন প্রশ্ন হল, কারখানা বন্ধে শ্রমিকদের যে দুর্দশা শুরু হতে যাচ্ছে সেখানে আমাদের মানবতা কতখানি জাগ্রত হচ্ছে? রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি আমরা এই ইস্যু নিয়েও তো যুক্তিপূর্ণ তর্ক বিতর্ক করতে পারি।পারি না?

ছবিসুত্র: বিডিনিউজ24.কম., কালের কণ্ঠ এবং ইত্তেফাক অনলাইন।

***
ফিচার ছবি: নাসিরুল ইসলাম/ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম/ ঢাকা, জুন ১৭, ২০১২