ক্যাটেগরিঃ নাগরিক সমস্যা

লাঞ্চ টাইমে আজ উন্নয়ন অর্থনীতির উপর একটি জার্নাল এ চায়না আর ইন্ডিয়ার অর্থনীতির উপর একটি আর্টিকেল পড়ছিলাম। পড়া শেষে ভাবছিলাম যে আমাদের দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে প্রবন্ধকগুলো কী কী হতে পারে।বেশ কিছু সমস্যা চিহ্নিত করতে পেরেছি..যা আমি পরবর্তীতে সুযোগ সুবিধা মত ধারাবাহিক ভাবে লিখব বলে আশা করছি। আজ লিখছি “বিদ্যুত্ সমস্যা” নিয়ে যা কিনা আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে অন্যতম প্রধান অন্তরায় হয়ে দাড়িয়েছে।

কৃষি বলুন আর শিল্প বলুন, উত্পাদন বাড়ানোর জন্য বিদ্যুত্ একটি অন্যতম উপকরন । বেসিক অর্থনীতিতে উত্পাদনের জন্য বহুল ব্যবহৃত ৪টি উপকরন যথা ল্যান্ড, লেবার, কাপিট্যাল, ম্যানেজমেন্ট এর পাশাপাশি টেকনোলজি অবশ্যম্ভাবী উপকরন হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। আর এই টেকনোলজি পরিচালনার পিছনে রয়েছে বিদ্যুত্ এর অবদান। নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুত্ সাহায্য করতে পারে উত্পাদন বৃদ্ধিতে। বর্ধিত উত্পাদন দেশের চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্ত বিদেশে রপ্তানি করে দেশের উন্নয়নে সাহায্য করে। আর অন্যদিকে বিদ্যুত্ স্বল্পতার কারণে অর্থনৈতিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে।

বর্তমানে আমাদের দেশে বিদ্যুত্ চাহিদা দৈনিক সাড়ে সাত হাজার মেগাওয়াট এর থেকে সামান্য বেশি। সরকারী হিসাব মতে দেশের বিদ্যুত্ উত্পাদন কেন্দ্র থেকে সাড়ে পাচ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদন হচ্ছে। যদিও বর্তমান সরকারের তথ্য অনুসারে বিদ্যুত্ উত্পাদন বেড়েছে ৩৬ শতাংশ। কিন্তু এর পাশাপাশি বেড়েছে বিদ্যুতের চাহিদা। অর্থাত্ যোগানের তুলনায় বিদ্যুত্ চাহিদা অনেক বেশি। আর তাই এই চাপ কমাতে লোড শেডিং এর দৌরাত্ম। অন্যদিকে বিদ্যুত্ এর উত্পাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় বাড়ছে সরকারের ভর্তুকি।

এবার বিদ্যুত্ উত্পাদনে সরকারের ব্যয় এবং ব্যয় সংকোচনে সরকারের পদক্ষেপ নিয়ে চলুন সংক্ষেপে কিছু আলোকপাত করি।

বিদ্যুত্ উত্পাদনের জন্য সূর্যের আলো, বায়ু, জল, গ্যাস, তেল, কয়লা ইত্যাদি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। আমাদের দেশে যেহেতু খরশ্রোতা পাহাড়ী নদীর সংখ্যা নগণ্য এবং এর জন্য প্রয়োজনীয় বিপুল বিনিয়োগ এর অভাব, তাই জলবিদ্যুত উত্পাদন বৃদ্ধির সম্ভাবনা অনেক কম। বাংলাদেশে তেলভিত্তিক মোট ৩৪টি বিদ্যুত্ কেন্দ্র আছে। যেহেতু আমাদের দেশে তেল আমদানি করতে হয় কাজেই এসব বিদ্যুত্ কেন্দ্রের উত্পাদন নির্ভর করে জ্বালানী তেলের দামের উপর। বিশ্ব বাজারে তেলের মূল্য বৃদ্ধি মানেই বিদ্যুত্ উত্পাদনে অতিরিক্ত খরচ, যা কিনা সরকারের আর্থিক সংকটের অন্যতম কারণ হয়ে দাড়িয়েছে। বিদ্যুত্ মন্ত্রণালয়ের সুত্র মোতাবেক তেল ভিত্তিক বিদ্যুত্ কেন্দ্র গুলি চালাতে দৈনিক গড়ে ২৩ থেকে ২৫ কোটি টাকার প্রয়োজন হয়। তেলের এই উচ্চ মূল্যের কারণে বর্তমানে ৮টি কেন্দ্র বন্ধ রাখতে সরকার বাধ্য হয়েছে। আর বাকি কেন্দ্রগুলে থেকে অনেক কম বিদ্যুত্ উত্পাদিত হচ্ছে। এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে বিশ্ব বাজারে অস্থিতিশীল তেলের বাজারে সরকার কেন তেল ভিত্তিক বিদ্যুত্ কেন্দ্রগুলো নির্মাণে বিপুল ব্যয় করেছিল? সে প্রশ্নের উত্তর খোজা যাবে আর একদিন।

বাংলাদেশে গ্যাস ও কয়লা থেকে ও বিদ্যুত্ উত্পাদন করা হয়ে থাকে। কিন্তু এক্ষেত্রেও সরকারকে দৈনিক গড়ে প্রায় ১৫ কোটি ভর্তুকি দিতে হয়। আর বিশাল এই ভর্তুকির ভার কমাতে সরকার জনগণের উপর বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পত্রিকা মারফত জানতে পারলাম যে পাইকারী বিদ্যুতের দাম গড়ে ৫০ শতাংশ আর খুচরা বিদ্যুতের দাম ৫৭ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে যা খুব শীঘ্রই কার্যকর করা হবে। যদিও ভোক্তাদের উপর দাম বাড়ানোর পরেও সরকারকে বার্ষিক ১২ হাজার কোটি টাকার স্থলে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি প্রদান করতে হবে বলে জানা যায়।

পাঠক এতক্ষণ যা বললাম, সহজ হিসাব..আসুন তাহলে কিছু কঠিন হিসাবের কথা এবার বলি। হিসাব তখনই কঠিন হবে যখন বিদ্যুত্ এর দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়বে দেশের আপামর জনসাধারণের উপর। এম্নিতেই মূল্যস্ফীতির অত্যাচারে জনজীবন দুর্বিষহ, নতুন দাম বৃদ্ধি জনগণকে অর্থনীতির উন্নয়নের কোন সুমিষ্ট স্বাদ দেবে তা সময়ই বলে দেবে। যদি এত কিছুর পর ও সরকার বিদ্যুত্ উত্পাদনে তার কাংখিত লক্ষ্যে পৌছাতে পারে, তবে একজন অর্থনীতিবিদ হিসেবে আশা করতেই পারি যে অর্থনীতির উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে আর এর পরোক্ষ প্রভাব পড়বে সাধারণ জনগণের জীবন যাত্রার উপর। কিন্তু যদি বরাবরের মত যদি এই গুরুত্বপূর্ণ খাত “দুষ্টু দুর্নীতির” খপ্পরে পড়ে, তবে জনগণের দুর্দিন ছাড়া আর কিছুই আশা করা যায় না।

ছবি ও তথ্য সুত্র: বিডি নিউজ।