ক্যাটেগরিঃ স্বাস্থ্য

 

দেশের সামগ্রিক পুষ্টি-পরিস্থিতি নিয়ে সর্বশেষ ২০১১ সালে বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপ প্রকাশ পায়। জরিপে বলা হয়, গত চার বছরে বাংলাদেশের পুষ্টি-পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। স্বাস্থ্য জরিপ এ বলা হয় যে বাংলাদেশে বর্তমানে ৪১ শতাংশ শিশু খর্বাকৃতির যা ২০০৭ সালের তুলনায় ২ শতাংশ কম। তবে এ প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, যেসব পরিবারের মায়েরা অশিক্ষিত, সেসব পরিবারে খর্বাকৃতির শিশুর হার ৫১ শতাংশ পর্যন্ত এবং সেসব পরিবারে শিশু মৃত্যর হার ও বেশি। জাতিসংঘের শিশু তহবিলের পুষ্টি বিশেষজ্ঞ এর মতে বাংলাদেশে যত শিশু মারা যায়, তাদের প্রায় ৫০ শতাংশের মৃত্যুর কারণ অপুষ্টি।

একটি শিশু যখন জন্ম নেয়, ছয় মাস বয়স পর্যন্ত তার দেহের পুষ্টি আসে মায়ের বুকের দুধ থেকে। কাজেই শিশুর দেহে পর্যাপ্ত পুষ্টি নিশ্চিত করতে হলে প্রসুতি মাকে পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে। কিন্তু আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে প্রসুতি মা পুষ্টিকর খাবার তো দূরের কথা, দু বেলা ভাত জোটে কী না সন্দেহ আছে। এর ফলে দুধের শিশুটি পর্যাপ্ত বুকের দুধের অভাবে থাকে ক্ষুধার্ত। দিন রাত কান্নাকাটি করে। আর নানী-দাদীদের পীর ফকিরের কাছে যাতায়াত বাড়ে। শিশু আর মায়ের শরীরে তাবিজ-কবজের সংখ্যাও বাড়ে। অপুষ্টির শিকার বাচ্চাটি এত কিছুর পর ভাগ্যক্রমে বেচে গেলে শুরু হয় আর এক যুদ্ধ।

৫/৬ মাস পর থেকে মাযের দুধের পাশাপাশি শিশুকে পুষ্টিকর শক্ত খাবার দিতে হয়। রঙিন সবজি, ভাত, রুটি, সুজি, ফল-মূল এবং মাছ বা মুরগি। আর একটু বড় হলে ডিম। কিন্তু মূল্যস্ফীতির এই বাজারে মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, ফলের কথা বাদই দিলাম, সবজির ও এমন আকাশ ছোয়া দাম যে দরিদ্র কিংবা নিম্ন মধ্যবিত্ত বাবা-মা তার আদরের শিশুটির পুষ্টি নিয়ে ভাবার অবকাশ কোথায়? লতা-পাতা কিংবা নুন দিয়ে ভাত কখনোই শিশুর পুষ্টি নিশ্চিত করতে পারে না।

আবার যারা উচ্চ মধ্যবিত্ত কিংবা বিত্তবান, তাদের বাচ্চাও অপুষ্টিতে ভুগে অজ্ঞতা ও অসচেতনতার কারণে। মোটা, নাদুস নুদুস বাচ্চা মানেই যে স্বাস্থ্যবান বাচ্চা নয়, তা অনেক শিক্ষিত পিতা-মাতাও হয়তো জানেন না। অর্থের প্রাচুর্জ্য কিংবা আহ্লাদিপনাই হোক ছোট শিশুটি হাটতে শেখার আগেই আমরা অস্বাস্থ্যকর চিপস, চকলেট, কোক, ভাজা-পোড়া, জুস কিংবা বিস্কুট খেতে দেই। বাচ্চা কিছু খায় না, তাই যা খেয়ে পেট ভরে, তা অপুষ্টিকর হলেও শিক্ষিত বাবা-মারা এসব খাবার বাচ্চাদের খেতে দেয়। সে অপুষ্টিকর খাবার যে আদরের সোনামনির অপুষ্টিতে ভোগার কারণ হতে পারে, তা কী আমরা কর্ম ব্যস্ত বাবা-মা ইচ্ছে করেই এড়িয়ে যাই?

একটি শিশু যখন পুষ্টিকর খাবার খায়, শরীরের সাথে তার মনের সুস্থতাও নিশ্চিত হয়। অপুষ্টির শিকার শিশুরা শারীরিকভাবে যেমন প্রতিবন্ধী হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তেমনি মানসিক নানা সমস্যায় ভুগতে পারে। শিশু যখন নানা অসুখ এ ভুগে তাদের সাথে স্বাভাবিকভাবে পিতা-মাতা ও ভুগে। চিকিত্সা খরচ যায় বেড়ে। যাদের চিকিত্সা করানোর সমর্থ নেই, তাদের বাচ্চা ধুকে ধুকে মৃত্যু বরণ করে। আবার বাসায় অসুস্থ বাচ্চা রেখে কোনও বাবা-মা ই কর্মে মনোযোগী হতে পারে না। এর ফলে শ্রম উত্পাদন ক্ষমতা হ্রাস পায়। এর পরোক্ষ প্রভাব পড়ে সামগ্রিক অর্থনীতিতে।তাই সরকারের উচিত শিশুদের ন্যূনতম পুষ্টি নিশ্চিত করার জন্য যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা। বাজেটে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ করা। দেশী-বিদেশী এনজিও গুলোকে কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে।সেই সাথে আমাদের ও পুষ্টি সম্বন্ধে যথাযথ সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।

শিশুরা জাতির ভবিষ্যত। স্বাস্থ্যবান সুস্থ শিশু একদিন বড় হবে। আপন মেধা দিয়ে এই দেশের হাল ধরবে।সুস্থ শিশুর নির্মল হাসির থেকে সুখের বিষয় আর কী কিছু হতে পারে?

ছবি সুত্র: ইন্টারনেট এবং আমার সাড়ে চার বছর এর ছেলে জাইম।