ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

মেয়েটার নাম রূথ। দক্ষিণ-পূর্ব আফ্রিকার দেশ মালাওই থেকে এসেছে। আমার মতই নরওয়ে সরকার এর বৃত্তি নিয়ে অর্থনীতি পড়তে এসেছে। ক্লাসের অন্য সহপাঠিদের মধ্যে সব থেকে চুপচাপ। কারও সাথে তেমন কথা বলতে দেখিনা। ওর দিকে তাকায় হাসি দিলেও ফিরতি হাসি দিতে দেখিনি কখনো। ওর কোনও বন্ধু নেই। ক্লাসের সবার সাথে বন্ধুত্ব হলেও ওর সাথে অনেকদিন পর্যন্ত আমার বন্ধুত্ব হয় নি।

ইকোনমেট্রিক্স ক্লাসে আমাদের গ্রুপ এসাইনমেন্ট ছিল। রূথ আমার কাছে এসে জানতে চায়, ও আমার সাথে কাজ করলে আমার কোনও আপত্তি আছে কী না। আমি কিছুটা অবাক হলেও রাজি হয়ে যাই। কিন্তু ও এত চুপচাপ আর আমি হলাম ওর বিপরীত। সারাদিন বকবক না করলে আমি অসুস্থ বোধ করি। এত সময় কথা না বলে থাকবো কী করে এটাই আমার চিন্তা। অনেক কিছু জিগগেস করলেও ওর কাছে তেমন উত্তর পেতাম না। আমি সারাক্ষণ বক বক করতাম। ও চুপচাপ শুনে যেত। মাঝে মাঝে দু একটা প্রশ্ন করতো।

একদিন আমার রুম এ বসে আমরা এসাইনমেন্ট এর কাজ করছিলাম। রূথ হঠাত্‍ চিত্কার করে বলে উঠল দেখ স্নো ফল হচ্ছে। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখি..তাই তো..কী অসম্ভব সুন্দর!!! ওর মত আমারও জীবনের প্রথম স্নো ফল দর্শন। অসম্ভব সুন্দর দৃশ্য যখন মুগ্ধ হয়ে দেখছি হঠাত্‍ খেয়াল করলাম রূথ কাদছে। ও অঝোরে কাদছে। আমি কিছুতেই বুঝতে পারছিনা স্নো ফল এর সাথে কান্নার সম্পর্ক কী? ও এভাবে কাদছে কেন? কিছুক্ষণ ধাতস্থ হবার পরে রূথ কথা শুরু করল…।

রুথের বাবা-মা কৃষি কাজ করে। ওর ছোট ৫ ভাইবোন আছে। ওর ছোটকালটা কেটেছে অসম্ভব দরিদ্রের মাঝে। কিন্তু তারপর ও ওরা খুব হাসিখুশি থাকতো । রূথ ছিল অসম্ভব চঞ্চল আর দুষ্টু। পাড়া প্রতিবেশীদের কাছ থেকে প্রায়ই ওর নামে বাসায় নালিশ আসতো। মায়ের বেদম পিটুনি খেয়েও ও নাকি হি হি করে হাসতো। পড়াশুনাতে ওর তেমন মন নাই। তার উপর বাসা থেকে অনেক দূরের পথ হেটে ওকে স্কুল এ যেতে হতো। স্কুল এ সারাদিন হৈ চৈ করে দিন কাটতো। কোনও মতে টেনেটুনে নাকি ও পাস করতো।

তখন ওর ১২/১৩ বছর বয়স হবে। স্কুল থেকে ফেরার পথে একদিন বখাটে একদল নরপশুর দ্বারা সে ধর্ষিতা হয়। দম বন্ধ করা কষ্টে ও জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল। জ্ঞান ফেরার পর অনেক কষ্টে বাসায় ফিরে। সেই রাতে গা কাপুনি দিয়ে ওর জ্বর আসে। সুস্থ হতে অনেক সময় লেগেছিল। ভয়ংকর ঘটনাটা হয়তো ও জ্বরের ঘোরে ওর মাকে বলেছিল কী না ও মনে করতে পারছিল না। সুস্থ হওয়ার পর ও আর স্কুল এ যায় নি। বাইরে খেলতে যাওয়া বা বন্ধুবান্ধব কারও সাথে ওর কথা বলতে আর ভাল লাগতো না।

এর ও কিছুদিন পরের কথা। রুথের শারীরিক পরিবর্তন ও নিজে টের না পেলেও অভিজ্ঞ মা এর চোখ ফাকি দিতে পারেনি। ওর মা বেশ দূরের এক ডাক্তারের কাছে রূথকে নিয়ে গিয়েছিল। মনে ক্ষীণ আশা। কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। বাচ্চা জন্ম দেয়া ছাড়া রুথের সামনে কোনও পথ খোলা ছিল না।

ওর বুদ্ধিমতি মা ছোট ভাইবোনদের বাবার কাছে রেখে রূথকে অনেক দূরে তার বোনের বাসায় নিয়ে গিয়েছিল। রুথের খালা একটা এনজিওতে ভাল চাকুরী করতো। অবিবাহিতা..একা থাকতো। সেখানে আলো বাতাসহিন একটা ঘরে রূথ অনেকটা বন্দীর মতই ছিল।ভাগ্যক্রমে ওই বাসায় ছিল বই এর ভান্ডার। একাকী সময়গুলো রূথ বই পড়ে কাটিয়েছিল। তার মধ্যে স্নো হোয়াইট ছিল ওর সব থেকে প্রিয়। অসংখ্যবার সে রূপকথার সেই বইটি পড়েছিল।

রুথের মা রুথের সাথেই থেকে গিয়েছিল। মাঝে মাঝে ওর বাবা ওর ছোট ভাইবোনদের আনা নেয়া করতো। এভাবেই দিন কেটে যায়। বদ্ধ সেই ঘরেই রূথ ওর মেয়ের জন্ম দেয়। ফুটফুটে তুলতুলে কৃষ্ণ কালো মেয়ে। ও ওর মেয়ের নাম রাখে স্নো হোয়াইট।

রুথের মা রূথকে আর বাসায় নিয়ে যায় নি। ওকে খালার বাসায় রেখে ছোট্ট বাচ্চা নিয়ে গ্রামের বাসায় চলে যায়। ওর বাবা ছাড়া সবাই জেনে যায় যে রুথের মায়ের আর ও একটি মেয়ে হয়েছে। ভাইবোনেরা জানল যে ওদের ছোট একটা বোন হয়েছে। আর প্রতিবেশীরা জানল যে রূথ শহরে স্কুল এ ভর্তি হয়েছে। ওখানে থেকেই পড়াশুনা করবে। মাঝে মাঝে বাসায় আসবে।

রূথ খালার বাসায় থেকে আবার স্কুল এ ভর্তি হয়। একদা হাসিখুশি রূথ আর ও চুপচাপ।ও দিন রাত শুধু বই নিয়েই থাকতো। একদা অমনোযোগী রূথ ক্লাসের মধ্যে সব থেকে ভাল রেজাল্ট করতে লাগলো। চুপচাপ রূথ স্নো হোয়াইটকে দেখার জন্য ভিতরে ভিতরে অস্থির হয়ে উঠত। পরীক্ষা শেষে করেই বাসায়। ছোট্ট স্নো তখন ভাঙ্গা ভাঙ্গা স্বরে ওর মাকে মা ডাকতে শিখেছে। রূথ তার কাছে অচেনা। রূথ খালার বাসায় ফিরে আসে। পড়াশুনার ফাকেই মাঝে মাঝে স্নো কে বাসায় গিয়ে দেখে আসতো। রূথ ধীরে ধীরে পড়াশুনার ধাপ শেষ করে। ওর অসম্ভব ভাল রেজাল্ট এর জন্য ও ওর বিশ্ববিদ্যালয়ে জয়েন করে। এরপর স্কলার্শিপ নিয়ে নরওয়ে।

স্নো এখন অনেক বড়। রূথকে তার বড় বোন বলেই জানে। ম্লান হেসে রূথ জানায় .স্নো কোনদিন জানবে না, তার মা কে..কিন্তু মা তো জানে যে তার মেয়ে কে..

রূথ ওর ঘরে চলে গেলে আমি ঝিম মেরে ভাবতে লাগলাম..ধর্ষিতা হওয়ার পরেও রূথ নিজেকে গড়ে তুলেছে..পরিবারের সাপোর্ট পেয়েছে..ওর মেয়েটাকে ও না পেলেও সে তো ওর পরিবার পেয়েছে..রূথ এবং ওর মা প্রমাণ করছে যে ধর্ষিতা হলেই মেয়ের জীবন শেষ হয়ে যায় না..নিস্পাপ রূথ তার জীবনকে অন্ধকারে মিশে যেতে দেয় নি..ও হেরে যায় নি..ও ওর দরিদ্র পরিবারের হাল ধরেছে..ভাই বোনেরা ভাল স্কুল কলেজে পড়ছে..ওর স্নো হোয়াইট বড় হয়ে উঠছে.. জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি রূথ বাইরে..সারা গায়ে স্নো..হয়তো ও ওর স্নো হোয়াইটকে স্পর্শ করছে অস্পৃশ্য অনুভূতি দিয়ে।