ক্যাটেগরিঃ ব্যক্তিত্ব, হুমায়ূন আহমেদ স্মরণে

“প্রথম আলো” পত্রিকাতে বরেণ্য লেখক হুমায়ুন আহমেদ এর “সুপার হিরো” লেখাটি আজ আবার পড়লাম। বেশ কিছুদিন আগে এই লেখাটি পড়েছিলাম এই একি পত্রিকায়। এই লেখাটির আগে সম্ভবত একই পত্রিকাতে তিনি ‘নো ফ্রি লাঞ্চ’ শিরোনামে একটি লেখা লিখেছিলেন। দুটি লেখাতেই সুস্পষ্ট ভাবে তাঁর মহতী একটি স্বপ্ন ও সেই স্বপ্নপূরণের দিকনির্দেশনা তিনি চমত্কার বর্ণনায় দিয়ে গেছেন আমাদের।

তাঁর সেই মহতী স্বপ্নটি হল বাংলাদেশে একটি বিশ্বমানের ক্যান্সার হাসপাতাল ও গবেষণাকেন্দ্র স্থাপন করা। আমাদের মত গরীব দেশে প্রতিনিয়ত মহামারী আকারে ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়ছে ঘরে ঘরে। দেশের অধিকাংশ মানুষের সামর্থ্য নেই বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা করা। চেয়ে চেয়ে প্রিয়জনের মৃত্য দেখা ছাড়া আমাদের অনেকেরই কিছু করার থাকে না। দুনিয়া ছেড়ে সবাইকে চলে যেতে হবে জেনেও তো আমরা বিনা চিকিত্সা প্রিয়জনকে চলে যেতে দিতে পারি না। তাই তো ভিটে মাটি বিক্রি করে হলেও ভারতে গিয়ে শত শত মানুষ চিকিত্সা করায়। কিন্তু আমরাও তো পারি আমাদের দেশে এরকম একটা হাসপাতাল গড়ে তুলতে। আমেরিকাতে ক্যান্সার এর ব্যয়বহুল চিকিত্সা করতে গিয়েই তিনি উপলপ্ধি করে গেছেন এরকম হাসপাতালের প্রয়োজনীয়তা। তিনি উপলপ্ধি করে গেছেন বাংলাদেশের হতদরিদ্র ক্যান্সার আক্রান্ত মানুষের কথা। তাইতো তিনি দেশে একটি উন্নতমানের ক্যান্সার হাসপাতাল গড়ে তোলার আকুতি জানিয়েছেন তাঁর লেখনীতে।

তিনি তাঁর সে স্বপ্নপূরণে নিজেকে সক্রিয়ভাবে যুক্ত করতে চেয়েছেন। তিনি আপামর জনসাধারণের সাহায্য চেয়েছেন। তিনি বলেছেন “আমি হাত পাতব সাধারণ মানুষের কাছে। এ মহতী উদ্যোগে তিনি যে অভূতপূর্ব সাড়া পেয়েছেন, সেটাও আমরা তার লেখা পড়ে জানতে পারি। “প্রথম আলো” পত্রিকার মন্তব্যের ঘরে শত শত পাঠকের “সঙ্গে আছি” সমর্থন থেকেও বুঝতে বাকি থাকে না তাঁর ওই স্বপ্ন ছুঁয়ে গিয়েছিল দেশের মানুষের হৃদয়ে। মানুষ ভাল উদ্যোগের জন্য শুধু একটা ডাক এর অপেক্ষা করে। সেটাও প্রমাণ হয়েছে আর ও একবার। সে ডাক যদি হয় হুমায়ুন আহমেদের মত মানুষের হয়, তাহলে তো কথাই নেই।

তিনি তাঁর এই উদ্যোগে কোনও ভাবেই রাজনীতিকে যুক্ত করতে চান নি। স্বভাবসুলভ ভাষাতেই তিনি এর কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। সচেতন দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে, তিনি ভাল করেই জানেন আমাদের জনপ্রতিনিধিদের চরিত্র। ওনারা এ কাজে জড়িত হলে যে তা কখনোই সফল হবার নয়, আমাদের মত তিনিও তা উপলপ্ধি করেছেন। তাইতো তিনি বলেছেন তাঁর স্বপ্নের ইন্সটিটিউট এ থাকবে না কোনও রাজনৈতিক দলাদলি, টেন্ডার বাজি কিংবা চাঁদাবাজি। তিনি স্পষ্ট করেই বলেছেন এটা হবে সম্পূর্ণ রাজনীতিমুক্ত প্রতিষ্ঠান। তাঁর এ কথাটি যেন আমাদের মনের কথারই প্রতিফলন!!!

হুমায়ুন আহমেদ বাস্তববাদী। কল্পনার মাধুরী দিযে তাঁর অসাধারণ লেখনী ফুটে উঠলেও এ ক্ষেত্রে তিনি বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করে সবাইকে জানিয়ে দিয়ে গেছেন যে হাসপাতাল তৈরি হবার সাথে সাথে তা বিশ্বমানের হবে না। কিন্তু আমাদের অবশ্যই তা বিশ্বমানের করার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে । কারণ তাঁর স্বপ্নের ইনস্টিটিউট হবে এশিয়ায় ক্যান্সার চিকিৎসার পীঠস্থান।যেখানে থাকবে বাংলাদেশের সেরা ডাক্তার। সর্বাধুনিক উন্নতমানের যন্ত্রপাতি আসবে বিশ্বের সেরা প্রতিষ্ঠান থেকে। সেসব যন্ত্রপাতি দেখাশোনা এবং পরিচালনার জন্যে দক্ষ শক্তিশালী টিম থাকবে।

তাঁর এই স্বপ্ন পূরণের উদ্যোগ আমাদেরকে অবশ্যই নিতে হবে। আমি এই বিশ্বাস ধারণ করি যে, প্রিয় হুমায়ুন আহমেদ দেশের মানুষের জন্য দেখা এই স্বপ্ন এখন আর তাঁর একার নয়, স্বপ্নদ্রষ্টা তাঁর সে স্বপ্ন ছড়িয়ে দিয়েছেন সবার মাঝে..এখন আমাদের কাজ হল সে স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেয়া।

তবে ভবিষ্যতে নির্মিত এই ক্যান্সার হাসপাতাল হুমায়ুন আহমেদ এর নামে হোক আমি তা চাইনা। হাসপাতালের নাম হতে পারে তাঁরই কোনও বইয়ের নাম এ। কেন যেন মনে হয় ব্যক্তি “নাম করণ” নিয়ে তাঁর আপত্তি আছে, তাইতো তাঁর শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পিতার স্মরণে তৈরি স্কুল এর নাম দিয়েছেন ” শহীদ স্মৃতি বিদ্যাপীঠ”।

হুমায়ুন আহমেদ ক্রিকেট ভালবাসতেন। বিশ্বকাপ ক্রিকেটের সময় পত্রপত্রিকাতে লেখা তাঁর সাক্ষাতকার ও লেখনীতে আমরা তা জেনে গেছি অনেক আগে। হুমায়ুন আহমেদকে চিত্কার করে বলতে ইচ্ছে করছে, আপনি কী শুনতে পারছেন, আপনার প্রিয় দল আয়ারল্যান্ডকে হোয়াইটওয়াস করে এখন আইসিসির টি-২০ র্যাঙ্কিংয়ে চতুর্থ স্থানে অবস্থান করছে। যে দেশটির অবস্থান ছিল শূন্য সে দেশ আজ পাকিস্তান, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড এবং ভারতকেও পিছনে ফেলেছে।

আপনি ভাল করেই জানতেন যে আমরা শূন্য থেকে শুরু করেও পৌছে যাই আমাদের লক্ষ্যে। তবে কেন আমরা পারব না, শূন্য থেকে শুরু করে আপনার শেষ স্বপ্ন পূরণ করতে? আমরা অবশ্যই পারব..এখন আপনাকে আমাদের প্রতিদান দেয়ার সময় এসেছে..আমরা পারবই..পারতে আমাদের হবেই।

সুত্র: প্রথম আলো এবং ক্রিকইনফো।