ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

গত ২৮ জুলাই, বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের যুক্তরাজ্য শাখা আয়োজিত এক ইফতার ও নৈশভোজে আমাদের মাননীয় প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রবাসী বাংলাদেশিদের দেশে বিনিয়োগ করার জন্য অনুরোধ করছেন।ঠিক একই দিনে বাংলাদেশে নিয়োজিত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজীনা বলছেন যে বাংলাদেশ বিনিয়োগের জন্য ঝুকিপূর্ণ একটি দেশ। আমি সম্পূর্ণ বিপরীত দুটি মন্তব্যকে আমার অর্থনীতির সীমিত জ্ঞান দ্বারা বিশ্লেষণ করব আজকের এই পোস্টটিতে। আগেই বলে রাখছি পোস্টটি সম্পূর্ণ একাডেমিক।

যেকোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বৈদেশিক বিনিয়োগ একটি অন্যতম সহায়ক হিসেবে বিবেচিত। কারণ বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেলে একদিকে যেমন কর্মসংস্থান এর সৃষ্টি হয় অন্যদিকে উত্পাদিত পণ্য বা সেবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সহায়তা করে থাকে। কাগজে কলমে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উপযোগী হিসেবে বিবেচিত হয়, কারণ এখানে অন্যান্য অনেক দেশের তুলনায় সস্তা শ্রম, বিদেশীদের বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রায় বারো বছরের ট্যাক্স হলিডে সুবিধা, অনেকক্ষেত্রে ট্যাক্স মওকুফকরণ, মুনাফা এবং ডিভিডেন্ট নিজের দেশে নিয়ে যাওয়ার সুবিধাসহ বিদেশী বিনিয়োগকারীদের তাদের বিনিয়োগের ১০০ % মালিকানা সুবিধা প্রদান করে থাকে।

কিন্তু প্রশ্ন হল বিনিয়োগের এত সুবিধা প্রদান করা সত্বেও বৈদেশিক বিনিয়োগে বাংলাদেশ কেন এখনো ঝুকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বিবেচিত?

এক্ষেত্রে কয়েকটি ফ্যাক্টর চিহ্নিত করা যেতে পারে, যেমন:

1.উত্পাদনের জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুত্, গ্যাস এবং পানির অভাব: বাংলাদেশে এনার্জি ক্রাইসিস এর কারণে বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ করতে উত্সাহ বোধ করেন না। দেশে বর্তমানে বিদ্যুত্ এর মারাত্মক ঘাটতি রয়েছে..এছাড়া দেশের অনেক স্থানে গ্যাস সরবরাহ নেই.. যে সব এলাকায় আছে, সেখানেও গ্যাস এর নিরবিচ্ছিন্ন সংযোগ থাকে না..আমাদের দেশে বিশেষ করে ঢাকা এবং এর পার্শ্ববর্তি এলাকাগুলিতে পানির তীব্র সংকট রয়েছে..তাছাড়া আমদানীকৃত জ্বালানী তেলের উচ্চ মূল্য যে বিনিয়োগ খরচ বৃদ্ধিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে, তা সহজেই অনুমেয়।

2. যোগাযোগ ব্যবস্থা অপ্রতুল: বাংলাদেশের রাস্তাঘাটের বেহাল অবস্থার সাথে আমাদের অনুন্নত সামুদ্রিক পোর্টও বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ থেকে বিমুখ করে। কারণ কাঁচামাল আমদানি ও তৈরি পণ্যকে রফতানি কিংবা বাজারজাতকরনের জন্য দরকার উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা। শুধুমাত্র অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে সম্ভাবনাময় পচনশীল অনেক পণ্যের বাজার আজ বিলুপ্ত প্রায়।

3. রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা: বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বৈদেশিক বিনিয়োগে একটি বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত। এদেশে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলেও বিরোধী দলের অসহযোগিতার কারণে হরতাল, জ্বালাও-পোড়াও আন্দোলনে অনেক সময় দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়, যার প্রভাব পড়ে বিনিয়োগকারীদের উপরে।

4. দুর্নীতি: আমাদের দেশের প্রতি সেক্টরে যেন দুর্নীতি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। বেশ কয়েকবার দুর্নীতিতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হবার কারণে বিনিয়োগকারীরা অনেক সময়ই সম্ভাব্য বিনিয়োগ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। এছাড়াও এদেশে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও স্বজনপ্রীতিও বিনিয়োগের অন্যতম প্রতিবন্ধক হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।

5. সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি: আমাদের দেশে দিনে দিনে আইন ও শাসন ব্যবস্থা যেন নাজুক হয়ে পড়ছে। বিনিয়োগকারীর পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ প্রায় সময়ই আইন প্রয়োগকারি সংস্থাগুলোর পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে। টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, ঘুষ, সন্ত্রাস বিনিয়োগকারীদের সম্ভাব্য বিনিয়োগ থেকে নিরুত্সাহিত করে থাকে।

এছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ইন্টারনেট এর ধীর গতি এসবকেও প্রতিবন্ধকতা হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।

এত সমস্যা তাই বলে কী বিদেশী বিনিয়োগ বন্ধ আছে?

না বিনিয়োগ বন্ধ নেই, যদিও এর গতি অনেক ধীর এবং শুধুমাত্র লাভজনক কয়েকটি ক্ষেত্রেই বিদেশী বিনিয়োগকারীদের উত্সাহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এর উপাত্ত অনুযায়ী বাংলাদেশে সব থেকে বেশি বিনিয়োগ টেলিকম সেক্টরে, তারপরই আছে পেট্রোলিয়াম এবং গ্যাস সেক্টরে। ন্যূনতম বিনিয়োগ করা হয় কৃষি খাতে।

তাই আমাদের প্রধানমন্ত্রী যখন প্রবাসে বাংলাদেশীদের বিনিয়োগের আহ্বান করছেন এবং আশ্বস্ত করছেন যে বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা হবে, আমরা নৈরাস্যবাদি না হয়ে আশা করতে পারি যে আমাদের কৃষিখাতে বিনিয়োগের সুব্যবস্থা করা হোক। সম্ভাবনাময় চিংড়ি, প্রক্রিয়াজাত খাবার, সবজি, ফল এসব যাতে আমরা বিদেশে আবার রপ্তানি করতে পারি, তার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হোক। আমাদের পণ্যবাজার যাতে অসাধু কিছু ব্যবসায়ীদের দ্বারা কলুষিত না হয়, তার ব্যবস্থা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনাকেই নিশ্চিত করতে হবে। আমরা চাই মজিনা মিথ্যা প্রমাণিত হোক। বাংলাদেশ ঝুকিপূর্ণ দেশ এর কলঙ্ক থেকে মুক্ত হোক । আর যদি তা না হয়, দেশের অর্থনীতির আকাশে যে কাল মেঘ ঘনিয়ে আসছে তা থেকে সূর্যের আলো পৌছানো দুরূহ ব্যাপার হয়ে পড়বে।

ছবি এবং তথ্য সুত্র: বিডি নিউজ ২৪ এবং বাংলাদেশ ব্যাংক।