ক্যাটেগরিঃ কৃষি

 

বেশ কিছুদিন ধরে হাইলাইটকৃত বিডিব্লগের একটি পোস্ট সম্প্রতি আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে..সম্মানিত ব্লগার বিন্দু বিসর্গের লেখা “কৃষি ঋণ না কৃষি পণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিতকরণ, কোনটা বেশি দরকার?”।

পোস্টটির কিছু ব্যাপারে আমার দ্বিমত আছে… যেহেতু ব্লগার স্বীকার করছেন যে তিনি অর্থনীতির ছাত্র নন, সাধারণ উপলব্ধি থেকে লিখেছেন, কাজেই একজন অর্থনীতিবিদ হিসেবে আমি দায়িত্ব ও তাগিদ অনুভব করছি অর্থনীতির সীমিত জ্ঞান দিয়ে আমার মতামত উপস্থাপন করার।আমার এই পোস্টটি একটি একাডেমিক পোস্ট।

আমার আপত্তি আছে লেখার শিরোনামটি নিয়ে। লেখক কৃষিঋণ এবং ন্যায্যমূল্যকে একটি আর একটির substitute হিসেবে বিবেচনা করেছেন। কোনটা আগে দরকার বা পরে দরকার বিষয়টি প্রকৃতপক্ষে তা নয়। ঋণ যদি কৃষি উত্পাদন বৃদ্ধিতে সহায়তা করে থাকে তবে তা উত্পাদন এর একটি ইনপুট হিসেবে বিবেচিত হবে।এটা উত্পাদনের অন্যতম একটি ফ্যাক্টর ক্যাপিটাল এর অন্তর্ভুক্ত হবে। আবার ঋণ এর সুদ অবশ্যই উতপাদন খরচ এর সাথে যুক্ত হবে।

অন্যদিকে, মূল্য বা দাম নির্ধারন হয়ে থাকে বাজার চাহিদা এবং যোগান এর উপর ভিত্তি করে। বাজার যদি প্রতিযোগিতামূলক হয়, তবে চাহিদা এবং যোগান রেখা যেখানে ছেদ করে সেখানে প্রতিযোগিতামূলক বাজারের মূল্য নির্ধারিত হয়ে থাকে। এখানে উল্লেখ্য যে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে যে কোনও ব্যক্তি উত্পাদন ও বিক্রয় কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে পারেন এবং যে কোনও সময় ব্যবসা বন্ধ করে বাজার ছেড়ে চলে যেতে পারেন। এখানে কোনও বাধ্যবাধকতা নেই।প্রতিযোগিতামূলক বাজারে ব্যবসায়ী বা উত্পাদকের সংখ্যার কোনও নিয়ন্ত্রণ না থাকায় যতক্ষণ পর্যন্ত ব্যবসাটিতে মুনাফা অর্জন সম্ভব ততক্ষণ পর্যন্ত উত্পাদক বা ব্যবসায়ী সেই পণ্যের বাজারে প্রবেশ করে। একারণে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে যোগানের পরিমাণ বেশি হয় এবং ভারসাম্য মূল্য মনোপোলি কিংবা অলিগপলি বাজার ব্যবস্থা থেকে কম হয়ে থাকে। পাঠকদের বোঝার স্বার্থে বলে রাখি যে মনোপোলি বাজার ব্যবস্থায একজন ব্যবসায়ীকতৃক এবং অলিগপোলীতে একের অধিক ব্যবসায়ীর দ্বারা বাজার ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে পণ্যের মূল্য বরাবরই প্রতিযোগিতামূলক বাজার ব্যবস্থা থেকে বেশি হয়ে থাকে। অর্থনীতির ভাষায় বলতে গেলে যেখানে মার্জিনাল কস্ট এবং মার্জিনাল রেভেনিউ রেখা ছেদ করে সেখানেই মনোপোলি বা অলিগপলি তার পণ্য Quantity নির্ধারন করে আর Profit maximising মূল্য নির্ধারন করেন বাজার চাহিদা রেখা থেকে।

অর্থনীতির এই বেসিক এর উপর ভিত্তি করে এখন আমাদের দেখতে হবে যে, কৃষির সেক্টর এ বাজার ব্যবস্থা কেমন? আলোচনার সুবিধার্থে আমরা ধরে নেই যে মাঠ পর্যায়ে কৃষি ব্যবস্থা প্রতিযোগিতামূলক। যে কোনও কৃষক ইচ্ছে করলেই যে কোনও কৃষিপণ্য উত্পাদন করতে পারে। এখানে বাঁধা দেয়ার কেউ নেই। আবার ইচ্ছে করলেই উত্পাদন বন্ধ করে দিতে পারেন। যেহেতু হার্ভেস্টিং পিরিয়ডে যোগান অনেক বেশি, সেক্ষেত্রে স্বাভাবিক ভাবেই দাম কম হবে। এরপর মাঠ থেকে পণ্যটি যখন বড় পাইকারী বাজারে আসে, তখন তার দাম হয় অনেক বেশি। কিন্তু কেন?

ল অফ ওয়ান প্রাইস (law of One Price) এর সুত্র অনুযায়ী হোলসেল ও পাইকারী মূল্য এর পার্থক্য হবে ট্রেড কস্ট এর উপর ভিত্তি করে। এখানে ট্রেড কস্ট বলতে ট্রান্সপোর্টেশন, ট্যাক্স, ইনফরমেশন কস্ট, ইত্যাদি সব কিছুই অন্তর্ভুক্ত। অভ্যন্তরীণ বাজারে আমরা শুধু ট্রান্সপোর্টেশন কস্টকেই বিবেচনা করতে পারি। এখন বাজার ব্যবস্থা যদি ইনিফিসিএণ্ট হয় তবে সহজেই অনুমেয় যে এর অন্যতম একটি কারণ হল মার্কেট পাওয়ার, যেখানে পণ্যমূল্য ও পণ্যের quantity প্রকৃত চাহিদা ও যোগান থেকে আলাদা করে ব্যবসায়ীরা নিজেরাই নির্ধারন করে থাকে। আমাদের দেশে মার্কেট ফেইলর এর অন্যতম কারণ হতে পারে “সিন্ডিকেট” নামক অলিগপলি বাজার ব্যবস্থা। আমাদের দেশে আমরা প্রতিটি পণ্য বাজারে ঠিক এই অবস্থাই দেখতে পাচ্ছি। আর কৃষি ক্ষেত্রে যে সমস্যাটি আমাদের দেশে প্রকট তা হল হোলসেল এবং পাইকারী মূল্যের মধ্যে “বাজার সমন্বয়” না থাকা।

ন্যায্য মূল্য বলতে আমরা বুঝি যে দামে কৃষকের উত্পাদন খরচ উঠিয়ে মুনাফা থাকবে। কিন্তু সেই ন্যায্য মূল্য নির্ধারন করা বিশেষ করে কৃষিক্ষেত্রে সব সময়ই সরকারের পক্ষে দুরূহ হয়ে পড়ে। হতে পারে এলাকা ভিত্তিক উত্পাদন খরচের ভিন্নতার কারণে, হতে পারে যথেষ্ট গবেষণা,উন্নত বাজার ব্যবস্থার অভাব কিংবা লোকবলের কারণে।ধান কিংবা আলুর মত পণ্যের যদিও বা মূল্য নির্ধারন করে দেয়া হয়, অধিকাংশ সময়ই গুদামজাতকরনের অভাবে কিংবা দীর্ঘসূত্রীতার কারণে কৃষকেরা তার থেকেও কম মূল্যে বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়।এছাড়া ফরিয়াদের দৌরাত্মতো আছেই।

কাজেই অর্থনীতিতে কৃষিপণ্যের মূল্য নির্ধারণের সাথে কৃষিঋণের ভূমিকা সামান্য থাকলেও তা কখনোই একটি আর একটির substitute নয়। কৃষিঋণ কেবল উত্পাদন বৃদ্ধি কিংবা এর সুদ উত্পাদন খরচ বৃদ্ধি করতে পারে..কিন্তু ন্যায্য মূল্যের পরিপূরক হতে পারে না।

এখন লেখকের পরামর্শ গুলোতে কিছুটা আলোকপাত করা যাক। আমরা কখন রপ্তানি করব? যখন অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্ত থাকবে তখন। কিন্তু আমাদের দেশে তো সময় সময় যোগানের ঘাটতি দেখা যায়, যা মূল্য বৃদ্ধির আরেকটি অন্যতম কারণ।তবে লেখকের অন্য পরামর্শগুলো অবশ্যই সরকার এবং নীতি নির্ধারকদের সদিচ্ছার উপর নির্ভর করে এবং সেগুলো খুব সহজেই অল্প খরচে করা সম্ভব। যেমন, যে স্থানে আলু বা ভুট্টার চাষ অনেক হয়, সেখানে যদি সরকার প্রক্রিয়াজাতকৃত খাদ্য যেমন চিপস, ভুট্টার আটা কিংবা অন্যান্য খাদ্য তৈরি শিল্প কারখানা গড়ে তুলতে পারে, তবে অনায়াসে কৃষকেরা তাদের অতিরিক্ত পণ্য সেখানে বিক্রয় করে সংরক্ষণ খরচ কমাতে পারে। আবার প্রক্রিয়াজাত খাবার দেশে বিক্রি করে উদ্বৃত্ত বিদেশেও রপ্তানি করা যায়। অন্যদিকে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেশের অর্থনীতিকে সচল করা যায়।

আমাদের দেশ উন্নয়নের অপার সম্ভাবনার দেশ। শুধু চাই একটু নীতিনির্ধারকদের সদিচ্ছা । আমরা কী তা আশা করতে পারি না?

****বিন্দু বিসর্গকে অনেক ধন্যবাদ চমত্কার এই বিষয়টি নিয়ে লেখার জন্য।