ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

বরাবরের মত এবারও বাংলাদেশের জনগণের জন্য ইসলামিক ফাউন্ডেশন কতৃক ফিতরা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। এবারের ফিতরা জনপ্রতি ৫৫ টাকা নির্ধারিত হয়েছে যা গত বছরের তুলনায় ২ টাকা বেশি. উল্লেখ্য গত বছর সর্বনিম্ন ফিতরা ছিল ৫৩ টাকা এবং তার আগের বছর ছিল ৪৫ টাকা (সুত্র, বিডিনিউজ ২৪ .কম)।

ফিতরাহ নির্ধারন সম্পর্কিত আমার প্রাসংগিক কিছু ভাবনা এবং কিছু প্রশ্ন আছে.. আশা করি ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা এই সব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করব।

প্রথমেই ফিতরাহ সম্পর্কিত হাদীসগুলো নিয়ে কিছুটা আলোকপাত করা যাক.. নিম্নে উল্লেখিত সব গুলো হাদীস সহীহ বুখারিহ শরীফ থেকে নেয়া হয়েছে।

১. হযরত ইবনে উমর (রা) কতৃক বর্ণিত আছে যে, মহানবী মুহাম্মদ (স) ফিতরাহ হিসেবে এক ছা’ খেজুর, অথবা এক ছা’ বার্লি প্রত্যেক মুসলিম নারী, পুরুষ এমনকি নাবালক এর উপর ওয়াজিব করেছেন এবং ঈদ-উল-ফিতরের নামাজের আগেই ফিতরাহ প্রদান এর প্রতি তিনি জোর প্রদান করেছেন। এখানে উল্লেখ্য যে এক ছা’ সমান প্রায় ৩ কেজি হিসাবে ধরা হয়।

২. বুখারী শরীফ এর অন্য একটি হাদিছে হযরত আবু সাঈদ (রা) কতৃক বর্ণিত, “আমরা সাধারনত জনপ্রতি এক ছা’ বার্লি সদকাতুল ফিতরাহ হিসেবে প্রদান করে থাকি।”

৩. অন্য একটি হাদীস হযরত আবু সাঈদ আল-খুদরী (রা) বর্ণিত, “আমরা সাধারনত এক ছা’ দৈনন্দিন খাদ্য (meal) বা এক ছা বার্লি অথবা এক ছা’ খেজুর বা এক ছা’ পনির বা এক ছা’ কিসমিস যাকাতুল ফিতর হিসেবে প্রদান করি।”

৪. হযরত আব্দুল্লাহ ইবন উমর (রা) কতৃক বর্ণিত, “নবীজী সকল মুসলিমকে আদেশ প্রদান করেন এক ছা’ খেজুর বা এক ছা’ বার্লি যাকাত-উল-ফিতর হিসেবে প্রদান করতে।”

৫. হযরত আবু সাঈদ আল-খুদরী (রা) কতৃক বর্ণিত যে “নবীজির জীবদ্দশায় আমরা এক ছা’ খাদ্য (food) অথবা এক ছা’ খেজুর অথবা এক ছা’ বার্লি, অথবা এক ছা’ কিসমিস সদকাতুল ফিতর হিসেবে প্রদান করি।” খলিফা মুয়াবিয়া ইবন আবু সুফিয়ান এর আমলে ফিতরাহ হিসেবে গম এর প্রচলন শুরু হয়। তিনি আরও বলেন যে এক মুদ্দ (mudd) গম সমান উপরে বর্ণিত যে কোনও পণ্যের ২ মুদ্দ (mudd)।

৬. অন্য একটি হাদিছে হযরত আবু সাঈদ আল-খুদরী (রা) বর্ণনা করেন যে, “নবীজী (স) এর জীবদ্দশায় আমরা ‘খাদ্য’ সদকাতুল ফিতর হিসেবে গরিবদের প্রদান করি। আর আমাদের খাদ্য হল সাধারনত বার্লি, কিসমিস, পনির অথবা খেজুর।”

৭. হযরত নাফি (রা) বলেন যে সে সময় মানুষ খেজুর, বার্লি, কিসমিস, পনির এর পরিবর্তে অর্ধ ছা’ গম ছদকাতুল ফিতর হিসেবে প্রদান করা শুরু করে।তিনি বলেন হযরত ইবনে উমর (র) সাধারনত খেজুর ফিতরা হিসেবে প্রদান করতেন। কিন্তু একবার মদিনা শরীফ এ খেজুর এর আকাল দেখা দিলে তিনি (উমর) বার্লি ফিতরা হিসেবে প্রদান করেন।

সহীহ বুখারী শরীফে ফিতরাহ নিয়ে আমি ১০টি হাদিছ খুঁজে পেয়েছি এবং তার মধ্যে উপরে উল্লেখিত ৭ টি পণ্যসংক্রান্ত। অধিকাংশ হাদিছে নবীজী যেসব পণ্য ফিতরাহ হিসেবে প্রদান করেছিলেন তার কথা বর্ণিত আছে। এখত্রে লক্ষ্যণীয় যে পরবর্তীতে খলিফা আমলে ফিতরাহ এর পণ্য তালিকায় গম এর প্রচলন শুরু হয়।

অর্থাত্, এ থেকে একটা বিষয় আমরা বলতে পারি যে, দৈনন্দিন খাদ্য হিসেবে আমরা সচরচর যে খাদ্যকে প্রধান খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে থাকি, তার মূল্যমান ধরে ফিতরা প্রদান করা যেতে পারে। যাকাত-উল-ফিতরাহ সংক্রান্ত কয়েকটি মুসলিম ওয়েবসাইট ঘেঁটে আমি যা পেলাম তার সারাংশ হল যে মুসলিম স্কলারগণ যে দেশের যা প্রধান খাদ্য তাকে তার উপর ফিতরাহ প্রদান করার জন্য তাঁদের মতামত প্রদান করেছেন। যার দেশে রুটি প্রধান খাদ্য সে গম এর উপরে, যার দেশে বার্লি সে বার্লির উপরে, আর যেখানে ভাত সেখানে চালের উপর ফিতরাহ নির্ধারিত হওয়ায়ই যুক্তিসঙ্গত।

আমাদের দেশের প্রায় সব মানুষের প্রধান খাদ্য হল ভাত। তাহলে আমাদের দেশে ফিতরাহ নির্ধারন হওয়া উচিত চালের মূল্যমান হিসেবে। কিন্তু ইসলামিক ফাউন্ডেশন এর জনসংযোগ কর্মকর্তা বিল্লাল বিন কাশেম এর ভাষ্যমতে, গম বা আটা, খেজুর, কিসমিস, পনির বা যবের যে কোনো একটি পণ্যের ১ কেজি ৬৫০ গ্রামের বাজার মূল্য ফিতরা হিসেবে গরিবদের মধ্যে বিতরণ করা যায় এবং এসব পণ্যের বাজার মূল্য হিসাব করে এবার ফিতরা নির্ধারণ করা হয়েছে সর্বনিম্ন ৫৫ টাকা থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা। কিন্তু এখানে উল্লেখ্য যে আমাদের দেশে উল্লেখিত একটি পণ্য আমরা দৈনন্দিন প্রধান খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করিনা।

ছা’ এর পরিমাপ নিয়েও আমার জিজ্ঞাস্য আছে। প্রায় সব ওয়েবসাইটগুলোতে ১ ছা’ সমান প্রায় ৩ কেজি গণ্য করা হয়েছে এবং হাদিছে শুধুমাত্র গম এর ক্ষেত্রে অর্ধ ছা’ বর্ণিত আছে। সে অনুপাতে ইসলামিক ফাউন্ডেশন কতৃক নির্ধারিত ১ কেজি ৬৫০ গ্রাম শুধু গম এর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে কিন্তু ঢালাওভাবে অন্যসব পণ্যের ক্ষেত্রে আমরা অর্ধ ছা’ ফিতরা প্রদান করতে পারিনা। কারণ এ বিষয়ে সব হাদীস শরীফ এ এক ছা’ প্রদানের প্রমাণ পাওয়া যায়।

কাজেই আমরা যে যা প্রধান খাদ্য হিসেবে খেয়ে থাকি তার প্রায় ৩ কিলো গড় মূল্যমান হিসেবে ফিতরা প্রদান করব এবং সেক্ষেত্রে আমার প্রশ্ন হল ইসলামিক ফাউন্ডেশন কতৃক ফিতরা নির্ধারন কতখানি যুক্তি সঙ্গত? আমি আমার সম্মানিত পাঠকদের মতামতের উপর ছেড়ে দিলাম। আমি আশা করছি আমরা ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকে গঠনমূলক আলোচনা করব। আমার বোঝার ভুল হতে পারে..এবং পাঠকদের জ্ঞানের আলোকে সে ভুল শুধরে নিতে পারলে আমি বরং অত্যন্ত কৃতজ্ঞ থাকবো।