ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 

“সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের চিরপ্রস্থান”!!!! বিডি নিউজ ২৪ এ খবরটা চোখে পড়া মাত্র মুহুর্তেই মনে হচ্ছিল, চারিদিকে শূন্য হয়ে আসছে। আমি যেন ক্রমেই অনুভূতিশূন্য হয়ে পড়ছি। বলে কয়ে কেউ যায় না জানি, কিন্তু প্রিয় কবি এভাবেও তো যেতে নেই!!!!!

লক্ষ্য করে দেখেছি বাংলাসাহিত্যের লেখাগুলিকে মিডিয়াতে মূলত এপার বাংলা আর ওপার বাংলা বলে ভাগ করে থাকে। এপার বাংলা মানে বাংলাদেশ আর ওপার বাংলা পশ্চিমবঙ্গ। সে মতে, কালীপদ গাঙ্গুলী আর মীরা গাঙ্গুলীর সন্তান সুনীলের জন্ম এপার বাংলার ফরিদপুরে ১৯৩৪ এর সেপ্টেম্বের মাসের ৭ তারিখে। চার বছর বয়সে পরিবারের সাথে তিনি চলে যান ওপার বাংলায়। পড়াশুনা করেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কবি হিসেবে সুনীল আত্মপ্রকাশ করেন ১৯৫১ সালে। তাঁর প্রথম কবিতা “একটি চিঠি” প্রকাশিত হয় দেশ পত্রিকায়। এরপর গল্পকার হিসেবে সুনীলের প্রথম ছোট গল্প “বাঁচা” প্রকাশিত হয় ইদানিং নামক ম্যাগাজিনে। তারপর শুধু সুনীলের এগিয়ে চলা। প্রায় ২০০র উপরে তিনি গল্প, উপন্যাস, কবিতা লিখেছেন। “সেই সময়” নামক উপন্যাসের জন্য সম্মানজনক সাহিত্য আকাদেমি পুরুস্কার পেয়েছেন। তাঁর বই ভালোবাসা প্রেম নয়, ভালোবাসা নাও হারিয়ে যেও না, নীরা হারিয়ে যেও না, সেই মুহূর্তে নীরা , আমি কী রকমভাবে বেঁচে আছি’, যুগলবন্দী, হঠাৎ নীরার জন্য, অর্ধেক জীবন, অরণ্যের দিনরাত্রি, প্রথম আলো, পূর্ব পশ্চিম, মনের মানুষ ইত্যাদি ইত্যাদি পাঠক হৃদয়ে ঠাই করে নিযেছে অতি সহজেই।

প্রিয় কবি শীর্ষেন্দুর সুনীলকে নিয়ে স্মৃতিচারণ মূলক লেখায় পড়েছিলাম যে সুনীলের লেখালেখির জন্য নাকি নিদৃষ্ট কোনও সময় ছিল না। অসম্ভব প্রতিভাধর, বন্ধুবত্সল, নিরহংকার সুনীল আড্ডা দিতে দিতেও লিখে ফেলতে পারতেন কবিতা বা উপন্যাস। পাঠক হিসেবে মুগ্ধ হই সুনীলের আটপৌরে ভঙ্গিতে সহজভাবে যেকোনো ভারী বিষয়ের উপস্থাপনাতে। তাঁর “প্রথম আলো” উপন্যাসে পেয়েছিলাম ইতিহাসের স্বাদ। সুনীলের সাহসী লেখনী অনেক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে একথা যেমন সত্যি, পাঠকের মাঝে বিষয়বস্তুর প্রতি জানার আগ্রহের জন্ম দিয়েছে তীব্র ভাবে। নারী পুরুষের মাঝে জটিল সম্পর্কগুলো অনায়াসে স্বভাব সুলভ ভঙ্গিতে উঠে এসেছে কবিতায় কিংবা উপন্যাসে।এ কথা স্বীকার করি যে সুনীলের সব গল্পকবিতা যে ভাল লেগেছে তা নয়, কিন্তু সুনীলের অসাধারণ কিছু লেখনী প্রজন্মের পর প্রজন্ম পড়ে যাবে। বাংলা ভাষাভাষীদের নিকট প্রিয় লেখকের তালিকায় সুনীল থাকবেন অন্যতম একজন হয়ে।

সুনীল নিয়ে আলোচনা করব আর নীরা থাকবে না, তা কী কখনো হয়? সুনীলের গল্পকবিতায় বিশাল একটা অংশ জুড়ে নীরা নামক রহস্যময়ীর বিচরণ। নীরাকে নিয়ে যাবতীয় প্রশ্নের ক্ষেত্রে সুনীল ছিলেন নিরব। কখনোই তিনি রহস্য উন্মোচন করেননি কে এই নীরা? অথচ নীরার জন্য সুনীলে লিখেছেন,

এই হাত ছুয়েছে নীরার মুখ
আমি কী এ হাতে কোনও পাপ করতে পারি?
………………………………………….
………………………………………………..
এই ওষ্ঠ বলেছে নীরাকে, ভালবাসি
এই ওষ্ঠে আর কোনও মিথ্যা কী মানায়?

কিংবা

তোমার হাতে গোলাপ, তুমি ফুলের কাছে ঋণী রইলে
তোমার হাতে গোলাপ, তুমি ফুলের কাছে ঋণী রইলে
বাসের অমন ভিড়ের মধ্যে মেয়েটা
আমাকে এক লাইন কবিতা দিয়ে হঠাত্ নম্র-নেত্রপাতে
বেলগাছিয়ায় নেমে গেল, রক্ত-গোলাপ-হাতে
বাকিটা পথ রইল শুধু ঘামের গন্ধ, ব্রিজের ধুলো
তোমার হাতে গোলাপ, তুমি আমার কাছে ঋণী রইলে।

প্রিয় সুনীল, তুমি বলনি নীরা কে? তাইতো অনায়াসে নিজেকে নীরা ভেবেছি..পুরুষেরা প্রেমিকাকে দেখেছে নীরা হিসেবে। দেখ তাকিয়ে তোমার নীরার চোখে আজ জল, তুমি নীরাকে দিয়েছ গোলাপ..তোমার লেখনী..তোমার নীরাকে তুমি আজন্ম ঋণীই রেখে গেলে।