ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

আবারও আমাদের প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাখাইন রাজ্যে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের সঙ্গে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের মধ্যে দাঙ্গা শুরু হয়েছে। পত্রিকায় প্রকাশ, নতুন করে শুরু হওয়া এ দাঙ্গায় কমপক্ষে ৮২ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের বসতিতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় কয়েক হাজার রোহিঙ্গা গৃহহীন হয়ে পড়েছে। বরাবরের মতই হাজার হাজার অসহায় রোহিঙ্গা সম্প্রদায় ট্রলার ও নৌকায় করে আশ্রয়ের জন্য বাংলাদেশে টেকনাফে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করেছে এবং বাংলাদেশ সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত অনুসারে কঠোরভাবে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ বন্ধ করার জন্য সীমান্তে নজরদারি বৃদ্ধি করেছে। সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে রোহিঙ্গা আটকের পর মিয়ানমারে পুশব্যাক করা হয়েছে।

রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়া না দেয়া নিয়ে আবারও নতুন করে শুরু হবে মানবতা বনাম বাস্তবতার বিতর্ক। আবার উদাহরণ টানা হবে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের আশ্রয়দাতার ভূমিকা নিয়ে। কিন্তু প্রশ্ন হল কিছুদিন পর পর পার্শ্ববর্তী দেশের ইচ্ছাকৃতভাবে সৃষ্ট নিজস্ব সমস্যা শুরু হলে সেই সমস্যা সমাধানে কেন আমাদের এই জনবহুল সমস্যা জর্জরিত দরিদ্র দেশের উপরে চাপ সৃষ্টি করা হবে? এর সমাধান কোথায়? বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের এ দেশে প্রবেশের অনুমতি দিলেই কী এ সমস্যার সমাধান হবে? তাই যদি হয় , তবে এ সমস্যার সমাধান এখনো হয়নি কেন? এ তো নতুন কোনও ইস্যু নয়!!! মানবতার খাতিরে ১৯৯১ সালের পর থেকে বাংলাদেশ কমপক্ষে দুই লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দান করেছে। টেকনাফ, উখিয়া ও কক্সবাজারের বিভিন্ন স্থানে বর্তমানে প্রায় পাঁচ লাখ অবৈধ রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করে বসতি গড়েছে । সে সময়ে বিপদে পড়া সাময়িক ভাবে আশ্রয় দেয়া শরণার্থীদের আজ পর্যন্ত বাংলাদেশ মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে পারেনি। পারবে কিভাবে? মিয়ানমার তো রোহিঙ্গাদের নাগরিক বলে স্বীকারই করে না!!! অতএব, বাংলাদেশ এখন তাদেরকে আশ্রয় দিতে বাধ্য।

এর ফলাফল কী হয়েছে যেদিন আশ্রয় দেয়া হয়েছিল সেদিন বোঝা না গেলেও আজ ২০১২ সালে এসে আমরা তা হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করতে পারছি। স্থানীয় বাংলাদেশীদের অভিযোগ, শ্রমবাজার এখন রোহিঙ্গাদের দখলে। স্থানীয় কয়েক হাজার শ্রমজীবী মানুষ বেকার হয়ে পড়েছে। রোহিঙ্গারা চুরি-ডাকাতি, মাদক, নারী পাচারসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশ নাগরিক পরিচয়ে বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে বাংলাদেশের শ্রমবাজার ধ্বংস করছে।

বিভিন্ন দাতা সংস্থা ও আন্তর্জাতিক সংগঠন রোহিঙ্গাদের শরণার্থীর মর্যাদা দিয়ে বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে রাখার জন্য সরকারকে চাপ দিয়ে আসছে । সেই সাথে মানবতার সুর মিলিয়ে বাংলাদেশের কতিপয় স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী ধর্মের দোহাই দিয়ে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেবার জন্য বিভিন্ন যুক্তি তারা তুলে ধরছে। কিন্তু কথা হল এভাবে কত দিন? সীমার বাহিরে কেউ নয়। সবারই নিজস্ব সামর্থ আছে। সন্তান জন্ম দেয়া হয়তো সহজ, কিন্তু তাকে প্রকৃত শিক্ষা দিয়ে লালন পালন করা আসলেই কঠিন। তেমনি সাময়িক আশ্রয় দেয়া হয়তো সহজ, কিন্তু তাদের প্রকৃত দেখভাল করার সামর্থ কী আদৌ আমাদের আছে?

আমরা অবশ্যই মানবাধিকারের পক্ষে। আর তাই আমরা চাই এ সমস্যার সমাধান হোক কূটনৈতিকভাবে। রোহিঙ্গা সমস্যা একটি আর্ন্তজাতিক সমস্যা। সুপরিকল্পিত ভাবে চাপিয়ে দেয়া এ সমস্যার সমাধান বাংলাদেশের একার পক্ষে করা সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক কমিউনিটির এখন উচিৎ বার্মায় সৈন্য পাঠিয়ে দাঙ্গা বন্ধ করা। অসহায় রোহিঙ্গাদের পাশে দাড়িয়ে তাদের রক্ষা করা। এছাড়া বাংলাদেশ সরকার মিয়ানমার সরকারের সাথে এ ইস্যু নিয়ে আলোচনা করতে পারে। পশ্চিমা দেশগুলো কিংবা তেলের টাকায় উপচে পড়া মুসলিম দেশগুলো রোহিঙ্গাদের আশ্রয়ে এগিয়ে আসতে পারে। জাতিসংঘ নামক বিশ্ব মাতবর সংস্থাটি মিয়ানমার সরকারের উপর চাপ প্রয়োগ করতে পারে কিংবা জবাবদিহিতা চাইতে পারে। কত উপায় তো আছে এই সমস্যা সমাধানের।

তবে কেন আমাদের দেশের জনগণের মাঝে দুদিন পর পর পার্শ্ববর্তী দেশের সমস্যা নিয়ে বিভেদ সৃষ্টি করা হচ্ছে? কেন মানবধিকার রক্ষার দায় শুধু আমাদের উপরই চাপিয়ে দেয়ার কথা বলা হচ্ছে? কেন শুধু আমাদের উপরই চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে? কেন? কেন?