ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

৭ নভেম্বর, বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির জন্য এই দিনটি “বিপ্লব ও সংহতি দিবস” নামে পরিচিত। আরেক প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামীলীগ এই দিনটিকে বাংলাদেশের ইতিহাসে কলঙ্কময় দিন হিসেবে অভিহিত করে থাকে। বলাবাহুল্য বিএনপি যখন ক্ষমতায় থাকে এই দিনটিকে মর্যাদা দেবার জন্য রাষ্ট্রীয় ছুটি ঘোষণা করে থাকে। আর আওয়ামীলীগ যখন ক্ষমতায় থাকে, এই দিনটিকে ন্যাককারজনক একটি দিন “মুক্তিযোদ্ধা হত্যা দিবস” হিসেবে পালন করে থাকে। আমার আজকের লেখার প্রধান উদ্দেশ্য ইতিহাসের আলোকে পক্ষে-বিপক্ষে এই দিনটিকে স্বল্প পরিসরে মূল্যায়ন করা।

৭ নভেম্বর আলোচনা করার পূর্বে আমরা একটু পিছনের ইতিহাসে যাই। ১৯৭১ এর ১৬ ডিসেম্বর এ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর বাংলাদেশ তার কাংখিত স্বাধীনতা লাভ করে। যুদ্ধবিধ্বস্ত শিশু দেশটির লালল পালনের দায়িত্ব অর্পিত হয় বঙ্গবন্ধুর হাতে। সাধারণ জনগণের চোখে তখন কষ্টার্জিত দেশ নিয়ে গড়া আকাশচুম্বী স্বপ্ন। কিন্তু জনগণের সে স্বপ্ন চুরমার হতে খুব বেশি সময় লাগেনি। ইতিহাস বলে, স্বাধীনতা পরবর্তী সরকারের একনায়কতন্ত্র, স্বজনপ্রীতি আর দুর্নীতির ভারে জনগণের জীবন পর্যুদস্ত। দুঃশাসনের প্রতিবাদ স্বরূপ ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টি অর্ধবেলা হরতাল ডাকে। সাধারণ জনগণ সে হরতালের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে। স্বাধীনতা পরবর্তী একটি দেশের সরকারের জন্য এই হরতাল হতে পারতো একটি সতর্কবার্তা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি আওয়ামীলীগের কতিপয় ব্যক্তি তখনও একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত।

১৯৭৩ সালের মার্চের প্রথম দিকে অনুষ্ঠিত ইলেকশন ইতিহাসের পাতায় একটি বিতর্কিত ইলেকশন বলে চিহ্নিত। ভোট চুরি, স্বজনপ্রীতি, পেশী শক্তি এবং কালো টাকায় মোড়ানো একটি ইলেকশন। এর পর ১৯৭৪ সালে আসে ইতিহাসের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। প্রাকৃতিক এই দুর্যোগে খাদ্যমূল্যের সীমাহীন মূল্যস্ফীতি এবং অনাহারে মানুষের মৃত্যু সাধারণ জনগণের মাঝে তত্‍কালীন সরকারের উপর চরম অসন্তোষ বয়ে আনে।

আওয়ামীলীগের মাঝেই তৈরি হয় বিভিন্ন গ্রুপ। ধারনা করা হয়,সেসময় সরকারের কাছের লোকেরাই ষড়যন্ত্রের জাল বুনতে শুরু করে। পরিণতিতে সংঘটিত হয় বাংলাদেশের ইতিহাসে কলংকিত হত্যাকান্ড। ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট স্ব্পরিবারে জাতির জনককে নৃশংস ভাবে হত্যা করা হয়। কাপুরুষদের ঘৃণার ছোবল থেকে ছোট্ট শিশু শেখ রাসেল পর্যন্ত রেহাই পাননি। নারকীয় এ হত্যাযজ্ঞের পর খন্দকার মোশতাক আহমদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।তিন বাহিনীর প্রধান তাঁর কাছে আনুগত্য প্রকাশ করেন।খন্দকার মোশতাক যে মন্ত্রিসভা গঠন করেন, তার বেশির ভাগ সদস্যই ছিলেন আওয়ামী লীগের। পরবর্তী পর্যায়ে জেনারেল জিয়াউর রহমানকে জেনারেল সফিউল্লাহর স্থলাভিষিক্ত করা হয়। খন্দকার মোশতাকের সরকার প্রায় আড়াই মাস স্থায়ী ছিল।

না..এখানেই ইতিহাসের শেষ নয়.. ২ নভেম্বর দিবাগত রাতে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে তাঁর পরিবারের সদস্যসহ গৃহবন্দি করেন। এরপর ৩ নভেম্বর খন্দকার মোশতাক আহমাদের প্ররোচনায় এক শ্রেণীর উচ্চাভিলাসী মধ্যম সারির জুনিয়র সেনা কর্মকর্তা জাতীয় চার বীর সেনানী শ্রদ্ধেয় তাজউদ্দিন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, আ.হ.ম কামরুজ্জামান এবং মনসুর আলীকে জেলের ভিতরেই নির্মমভাবে হত্যা করে। ইতিহাসের কলংকময় কালো দিন বলে বিবেচিত জেলহত্যা দিবসের এই দিনে খন্দকার মোশতাক আহমদ অপসারিত হন এবং তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সায়েম রাষ্ট্রপতির পদ গ্রহণ করেন। আওয়ামীলীগের মাঝে আশা ছিল যে খালেদ মোশাররফ বঙ্গবন্ধুর স্বীকৃত খুনিদের বিচার করবে। কিন্তু দেখা যায় যে, কর্তৃত্ব হাতে পাওয়ার পরে খালেদ মোশাররফ বঙ্গবন্ধুর খুনীদের সাথে আপোষরফায় আসেন এবং খুনীদের নির্বিঘ্নে দেশ ত্যাগ করে পালিয়ে যেতে সহযোগিতা করেন।

সেনা অভ্যুত্থানের স্বপক্ষের যুক্তি
সেনা অভ্যিত্থানের স্বপক্ষের যুক্তি অনুযায়ী, খালেদ মোশাররফ সেনাবাহিনীর কর্তৃত্ব নেয়ার পর সেনাবাহিনীতে সৃষ্টি হয় এক ভয়াবহ অরাজক পরিস্থিতি। এমতাবস্থায়, ইতোপূর্বে অবসর নেওয়া মুক্তিযোদ্ধা কর্ণেল আবু তাহেরের নের্তৃত্বে ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থান সংগঠিত হয়।কথিত আছে যে, কর্ণেল তাহেরের নেতৃত্বে বিপ্লবী সৈনিকেরা একত্রিত হয়ে ৭ নভেম্বর এই দিনে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সেনাবাহিনী ও জনগণের মধ্যে আস্থা তৈরী করে। তাদের প্রচেষ্টায় অস্থিতিশীল সেনাবাহিনীর মধ্যে চেইন অব কমান্ড ফিরে আসে। তাই স্বপক্ষের শক্তি এই দিনকে বিপ্লব ও সংহতি দিবস বলে ঘোষণা করে।

সেনা অভ্যুত্থানের বিপক্ষে যুক্তি
বিপক্ষের যুক্তি হল, ৭ নভেম্বর ১৯৭৫, এই দিনে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী বীর সেনানী কর্নেল এ.টি.এম হায়দার বীর উত্তম,কর্নেল নাজমুল হুদা বীর বিক্রম ও খালেদ মোশাররফসহ আরো অসংখ্য নারী পুরুষকে।মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানীদের সেনা অভ্যুত্থানের দ্বারা সংঘটিত এই হত্যাযজ্ঞ তাই ইতিহাসের পাতায় ঘৃণিত। এর মাধ্যমে জন্ম নিয়েছে সামরিক শাসন।

যদিও উকিপিডিয়ায় পাওয়া তথ্যনুসারে বলা হয় যে, ৭ নভেম্বর কর্নেল তাহের জিয়াউর রহমানকে বন্দী দশা থেকে মুক্ত করেছিলেন। কিন্তু এ ব্যাপারে ইতিহাসবিদদের মাঝে মতান্তর আছে। অনেকের মতে মেজর জেনারেল আমিনুল হকের নেত্রীত্বে সেনাবিহিনীর জওয়ানরা জিয়াকে মুক্ত করেন। আর জিয়ার মুক্তির খবর কর্নেল তাহের বাংলাদেশ বেতার ভবনে বসে জেনেছিলেন (সুত্র: বিচিত্রা ও ১৯৭৫ এর পরে পরে প্রকাশিত বিভিন্ন ম্যাগাজিন এবং সেসময়ের সাক্ষী সম্মানিত ব্লগার হৃদয়ে বাংলাদেশের স্মৃতি থেকে)। পরবর্তীতে ক্ষমতাসিন জিয়াউর রহমান অভ্যুত্থানকারী ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ কঠোর ব্যবস্থা গ্রহন করেন এবং সেনাবাহিনীর নিজস্ব বিচার প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সেনাবিহিনীর শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে কর্ণেল তাহেরর ফাঁসি কার্যকর করা হয়।

এখন প্রশ্ন জাগে, ১৫ আগস্ট, ৩ নভেম্বর বা ৭ নভেম্বর সংঘটিত ঘটনার পিছনে জিয়াউর রহমানের আদৌ কোনো ভূমিকা ছিল কী না? কেন এই দিনটিকে নিয়ে প্রধান দু দলের মধ্যে সম্পূর্ণ বিপরিত্ধর্মী ইতিহাস লেখা হয়েছে? আমরা যারা ৭৫ এর অনেক পরে জন্মেছি, আমরা এখনো দ্বিধান্বিত। আসলে সত্যি কী? নিরপেক্ষ ইতিহাসবিদের দ্বারা সত্য উদঘাটন দরকার। সে সত্য যতই কঠিন ও তেতো হোক না কেন, আমাদের জানা দরকার সে সত্য। ৭ নভেম্বরের এই দিবসে সত্যের জয় হোক। জাতি জানুক প্রকৃত সত্য। মনে আশা যে অপ্রকাশিত সত্য একদিন উদঘাটিত হবেই হবে। নির্ভেজাল নির্মোহ সত্য। আমরা অধীর অপেক্ষায় আছি সে সত্যকে আলিঙ্গন করে সামনে এগিয়ে যেতে। সত্যের জয় হোক। নিপাত যাক যত ভ্রান্ত ইতিহাস।

সুত্র: নেটে প্রাপ্ত বিভিন্ন আর্টিকেল এবং ব্লগার হৃদয়ে বাংলাদেশ