ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

আমার ব্লগীয় শিরোনাম ব্যাখ্যা করছি একটু পরে..তার আগে সাম্প্রতিককালে ঘটে যাওয়া তুলনামূলকভাবে মিডিয়ার চোখে কম গুরুত্বপূর্ণ অথচ বাস্তবিক অর্থে অতি গুরুত্বপূর্ণ দুটি ঘটনা আবারও জেনে নেই সংক্ষেপে..

ঘটনা ১:

দক্ষিণখানের নোয়াপাড়া আমতলার ব্র্যাক চালিত একটি ক্লিনিকের খণ্ডকালীন চিকিত্সক ছিলেন ডাঃ সাজিয়া। গত ২৯ নভেম্বর দায়িত্ব পালনের পর রাত ১২টার দিকে তিনি ওই ক্লিনিকের বিশ্রামাগারে ঘুমাতে যান। অতঃপর ক্লিনিকের কর্মচারী মো. ফয়সাল নামক এক নরপশুর কামনার শিকার হতে নিজেকে বাঁচাতে গিয়ে লাশ হতে হয় তাকে। নিজের সম্ভম বাঁচাতে দানবের সাথে তাকে অনেক যুদ্ধ করতে হয়েছিল। তাইতো পরদিন সকালে ক্লিনিকের অন্য কর্মচারীরা তার রক্তাক্ত জখমী লাশ উদ্ধার করে।

ঘটনা ২:

দাউদকান্দি উপজেলার সোনাকান্দা মাদ্রাসার অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী ফারজানার ওপর ১১ নভেম্বর রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় মালকান্দি গ্রামের কালু মিয়ার ছেলে সাদ্দাম হোসেন ও তার সাঙ্গপাঙ্গ বখাটেরা ঘরের জানালা দিয়ে এসিড নিক্ষেপ করে। অসহনীয় কষ্ট নিয়ে ২২ দিন মৃত্যুর সাথে যুদ্ধ করে গত ৩ ডিসেম্বর চিরতরে থমকে গিয়েছেন ফারজানা।

পাঠক, ইতোমধ্যেই হয়তো আপনারা জেনে গেছেন যে ডাঃ সাজিয়ার খুনী সেই নরপশু ফয়সালকে গ্রেফতার করা হয়েছে, সে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছে এবং আমরা আশা করতে পারি যেহেতু এই নিম্ন পদস্থ কর্মচারীর প্রভাবশালী রাজনৈতিক প্রতিপত্তি খুব বেশি হবার সম্ভাবনা তেমন নেই..কাজেই তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি আজ না হয় কাল হবেই হবে..কিংবা জেলেই পচে মরবে।অপরদিকে ফারজানার মূল আসামি গ্রেফতার না হলেও অন্যদের গ্রেফতার করা হয়েছে..আশা করা যায় উক্ত এলাকার হাজী সাহেবের মেয়ে ফারজানার খুনী বখাটে কালু মিয়ার পোলা, অতি শীঘ্র ধরা পড়বে এবং বিচারের আওতায় আসবে।

আমি কিন্তু ভাবছি অন্য কথা..এই দুটি ঘটনা কিংবা এর সাথে মিলিয়ে আরও ঘটনা।যেমন, উচ্চবিত্ত ঘরের শাজরিন হত্যাকান্ড কিংবা পশু পরিমলের দ্বারা ভিখারুননেছা স্কুলের উচ্চবিত্ত ঘরের কিশোরী মেয়েটির যৌন নির্যাতন কিংবা প্রেমিকের সাথে পরম বিশ্বাসে বেড়াতে যাওয়া তথাকথিত প্রেমিক ও তার বন্ধুদের দ্বারা পাহাড়ী মেয়েটির গণধর্ষণ এসব আসলে কিসের ইঙ্গিত বহন করে?

এর কারণ কী হতে পারে চিন্তা করতে গিয়ে কেবল একটা কথাই বারবার মনে হচ্ছে যে, নারী কী তাহলে কেবলই দেহ সর্বস্ব এক প্রাণী? যে কিনা যেকোনো সময় যেকোনো খানে যেকোনো ব্যক্তির কামনার আগুনে পুড়ে যেতেই জন্মেছে?

আমি অনেক তথাকথিত সুশীলদের বলতে শুনেছি, মেয়েরা নাকি যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে থাকে নিজের দোষে!!!কী সেই দোষ? দোষটি হল কেন সে পর্দার আড়ালে থাকে না? কেন সে ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলে না? নিজেকে ঢেকে রাখলেই তো ঝামেলা শেষ..পুরুষদের নাকি কামনার আগুন এম্নিতেই ঢেকে থাকা মেয়েদের দিকে তাকালেই নিভে যায়!!! তাদের কথা শুনলে মনে হয় যেন ইভ টিজিং কিংবা ধর্ষিতা কিংবা এসিডের শিকার হয় মেয়েরা নিজেদের দোষেই.. তাই যদি হবে, তাকিয়ে দেখুন তো উপরের মেয়ে দুটির ছবির দিকে..কোথাও কী তারা এতটুকু অশালীন মনে হচ্ছে? ওদের দেখে কী নরপশুর কামনার আগুন নিভেছে? তাহলে পর্দা প্রথা কিভাবে এই নারীদের নিরাপত্তা দিচ্ছে? কোথায় দিচ্ছে? নিজের বাসার ভেতর? না ।ব্যস্ত ক্লিনিকের নিরাপদ বিশ্রামাগারে? না ।স্কুলের ভিতর কিংবা পরম শ্রদ্ধেয় (???) শিক্ষকের কাছে? প্রেমিকের কাছে না হয় বাদই দিলাম, এমনকি নিরাপত্তা দেবে যে পুলিশ সেখানেও না ।

এই ঘটনাগুলো থেকে অন্তত একটা বিষয় পরিষ্কার যে, আমাদের সমাজে বিদ্যমান যে শ্রেণীগুলো আছে, সেখানে উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত, শিক্ষিত এমনকি প্রভাবশালী পিতামাতার সন্তান হয়েও, মেয়েরা পদে পদে যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন । আর নিম্নশ্রেণীর নারীদের অবস্থা কী ভয়াবহ হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। প্রতিদিন নিগৃহিত হওয়া এইসব হতভাগীদের কথা হয়তো কোথাও ছাপা হয় না, বিচারের দ্বারস্থ হবার মত দিবাস্বপ্ন দেখার সাহস করার তো প্রশ্নই আসে না!!

তাহলে, এই সামাজিক ভয়াবহ ব্যাধির সমাধান কী? হতে পারে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। ছুড়ে মারা বখাটেকে এসিডের ভিতর চুবিয়ে মারা? ধর্ষণকারি পুরুষের লিঙ্গ কর্তন? ফাঁসি? যাবজ্জীবন? কী দিয়ে রোধ করা যেতে পারে নারীর প্রতি এই যৌন নির্যাতন? অতীতেও তা অনেকে সাজা পেয়েছে, কেউ খালাসও পেয়েছে..আইন আছে, শাস্তি আছে..তারপরও কেন রোধ হচ্ছেনা নরপশুদের দ্বারা নারীদের যৌন হয়রানি? যেগুলো ঘটনা সমাজে জানাজানি হচ্ছে, সেগুলোকে না হয় কোনও না কোনভাবে শাস্তির আওতায় আনা সম্ভব হয়ে থাকে..কিন্তু পথেঘাটে ,বাসে, অফিসে, এমনকি বাসায় যৌন হয়রানি বন্ধ হবে কিভাবে?

সমাধানে বারবার একটা কথাই মনে হয়েছে, নারীদের প্রতি পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গী বদলে দেয়া প্রয়োজন। আর সেই দৃষ্টিভঙ্গী বদলের জন্য পুরা সমাজকে নৈতিক শিক্ষার ভীত দৃঢ় করতে হবে। শিক্ষার সার্থক উপলব্ধি ছাড়া দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন কখনোই সম্ভব নয়।কাজেই বদলে যাওয়া দৃষ্টিভঙ্গির মূলমন্ত্র থেকে পুরুষ শিখুক যে, নারী কেবল শরীর সর্বস্ব কোনও জীব নয়। যৌন কামনা নিবৃত্ত করার জন্যই নারীর জন্ম হয়নি..পুরুষ বিসর্জন দিক পশুত্বের..জানোয়ার থেকে পুরুষ হোক প্রকৃত মানুষ।

তথ্য সুত্র: প্রথম আলো ও বিডি নিউজ ২৪।
কৃতজ্ঞতা স্বীকার: সম্মানিত ব্লগার আসাদুজজেমান।