ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

মুক্তিযুদ্ধের বিজয় ইতিহাস মানেই বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাঁথা, ৩০ লক্ষ শহীদের আত্মত্যাগ, এবং যুদ্ধ চলাকালীন সময় ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের শিকার সেই অসহায় নারীদের কথা সবার আগে মনে পড়ে। আজ এই লেখায় আমাদের মুক্তিযুদ্ধে নারীদের অসহায় নির্যাতনের কথাই লিখব..পরবর্তীতে ধারাবাহিকভাবে যুদ্ধনারীদের নিয়ে লেখার ইচ্ছে পোষণ করি।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, মুক্তিযুদ্ধে আড়াই লাখ নারী ধর্ষিত হয়েছে যাঁদের স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে “বীরাঙ্গনা” উপাধিতে ভূষিত করা হয়। যদিও এখনকার প্রজন্মের অনেকেই বীরাঙ্গনা না বলে তাদেরকেও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার পক্ষপাতী। আমি আজ সেই তর্কে-বিতর্কে যাব না..আলোচনার সুবিধার্থে তাঁদের অফিসিয়াল বীরাঙ্গনা নাম নিয়েই এই লেখাটি লিখে যাব। বীরাঙ্গনাদের নিয়ে লিখতে বসে বাংলাভাষায় মুক্তিযুদ্ধের উপর তথ্য নিয়ে তৈরীকৃত উইকিতে এর সংগা দেখে চমকে উঠলাম। উইকিতে বীরাঙ্গনার সংগা লেখা হয়েছে, এভাবে,

” বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে কয়েক লাখ নারী পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এইসব নারীদেরকে বীরাঙ্গনা অভিধায় অভিহিত করা হয়ে থাকে”

(সুত্র: উইকিপিডিয়া)।

আসলেই কী তাই? এটাই কী বীরাঙ্গনা এর প্রকৃত সংগা? আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় নিপীড়িত ও নির্যাতিত নারী কী শুধুই পাকিস্তানী বর্বরদের দ্বারাই যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন? তাদের বীরাঙ্গনা করার পিছনে কী ঘৃণ্য রাজাকারদের অবদানের কথা আমরা বিস্মৃত হব? মাথায় টুপি, তসবি হাতে নিয়ে সব সময় আল্লাহ রাসূলের নাম নেয়া সেইসব রাজাকারদের দ্বারা কী তারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্যাতনের শিকার হন নি? গ্রামে গঞ্জে কার বাসায় কোন কোন বয়সী নারী আছে সেসব খবর দেয়া ছাড়াও জোর জবরদস্থি করে হিন্দু-মুসলিম মা-বোনদের দানবের হাতে এরাই তুলে দিয়েছিল..ধর্ষণের শিকার সেইসব নারীদের আর্তনাদ তারা বন্ধ দরজার ওপাশে দাড়িয়ে সুরমা চোখে, তসবি জপে শুনেছিল আর পাকিদের যৌন তৃপ্তি নিশ্চিত করতে পেরেছিল ভেবে আল্লাহর কাছে শুকরানাও আদায় করেছিল।

কুখ্যাত দেউলা/বাচ্চু রাজাকার যে কিনা এখন জামায়াতে ইসলামীর প্রথম সারির নেতা, যার যুদ্ধাপরাধী হিসেবে বিচার এর রায় এখন অপেক্ষমান..অধীর আগ্রহ নিয়ে এই রাজাকার এর ফাঁসি দেখার জন্য স্বাধীনতার স্ব্পক্ষের সবাই অধীর হয়ে আছি, তার মুক্তিযুদ্ধকালীন ঘৃণ্য ভূমিকা ছিল মুক্তিযোদ্ধা নির্যাতন ও হত্যা, নারী ধর্ষণ ও লুটপাট। রাজাকারের উপর লেখা তথ্যাদি থেকে জানা যায় যে, মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময় এই নর্দমার কীট পাকহানাদার বাহিনীর সহযোগিতায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিল। পিরোজপুরের বিভিন্ন এলাকা থেকে মা বোনদের ধরে নিয়ে পাক হায়েনাদের ক্যাম্পে পাঠানোর মতো জঘন্য কাজটি করত এই জানোয়ার। এই নরপশুর নেতৃত্বে সেই সময় জানোয়ারেরা পাড়ের হাট এলাকার স্থানীয় হরিসাধু ও বিপদ সাহার মেয়ের ওপর পাশবিক নির্যাতন চালায় (সুত্র: পাড়ের হাট ইউনিয়নের সাবেক পিপি এ্যাডভোকেট আবদুর রাজ্জাক খান, দৈনিক জনকন্ঠ, ৬ এপ্রিল ২০১০)।

মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে রাজাকার দ্বারা নারী নির্যাতনের বর্ণনা পাওয়া যায় ১৯৭১ সালে ২০ জুন প্রকাশিত সানডে টাইমস-এ লেখা ‘পাকিস্তানে সংঘবদ্ধ নির্যাতন’ শিরোনামের প্রতিবেদনে। সংবাদে বলা হয়,

‘হত্যা ও নির্যাতনের বাইরেও এখন রাজাকাররা তাদের অপারেশন বিস্তৃত করেছে। তারা মেয়েদের ধরে নিয়ে পতিতা বানাচ্ছে। ধরে নেওয়া তরুণীদের দিয়ে সেনাবাহিনীর সিনিয়র অফিসারদের রাতের মনোরঞ্জনের জন্য চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে তারা একটি ক্যাম্প বানিয়েছে। বিভিন্ন্ন অনুষ্ঠানের কথা বলে মেয়েদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে তারা। তাদের মধ্যে অনেকেই ফিরে আসেনি। নামকরা বাঙালি সংগীতশিল্পী ফেরদৌসী এ রকম পরিস্থিতি থেকে অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছেন।’

চলুন দেখি হায়েনাদের হাতে তুলে দেয়ার পর আমাদের সেই সব মা-বোনদের কী দশা হয়েছিল।

ডা. এম এ হাসান লিখিত “যুদ্ধ ও নারী” গ্রন্থে বলেছেন,

“২৬ মার্চ ১৯৭১,বিভিন্ন স্কুল,কলেজ,বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মেয়েদের ধরে আনা হয়।আসা মাত্রই সৈনিকরা উল্লাসে ফেটে পড়ে।তারা ব্যারাকে ঢুকে প্রতিটি যুবতী,মহিলা এবং বালিকার পরনের কাপড় খুলে সম্পূর্ণ উলঙ্গ করে লাথি মেরে মাটিতে ফেলে ধর্ষণে লিপ্ত হতে থাকে।….পাকসেনারা ধর্ষন করেই থেকে থাকেনি,সেই মেয়েদের বুকের স্তন ও গালের মাংস কামড়াতে কামড়াতে রক্তাক্ত করে দেয়,মাংস তুলে নেয়।মেয়েদের গাল,পেট,ঘাড়,বুক,পিঠ ও কোমরের অংশ তাদের কামড়ে রক্তাক্ত হয়ে যায়।এভাবে চলতে থাকে প্রতিদিন।যেসব মেয়েরা প্রাথমিকভাবে প্রতিবাদ করত তাদের স্তন ছিড়ে ফেলা হত,যোনি ও গুহ্যদ্বা্রের মধ্যে বন্দুকের নল,বেয়নেট ও ধারালো ছুরি ঢূকিয়ে হত্যা করা হত।বহু অল্প বয়স্ক বালিকা উপুর্যুপুরি ধর্ষণে নিহত হয়।এর পরে লাশগুলো ছুরি দিয়ে কেটে বস্তায় ভরে বাইরে ফেলে দেয়া হত।হেড কোয়ার্টারের দুই,তিন এবং চারতলায় এই্ মেয়েদের রাখা হত,মোটা রডের সাথে চুল বেঁধে।এইসব ঝুলন্ত মেয়েদের কোমরে ব্যাটন দিয়ে আঘাত করা হত প্রায় নিয়মিত,কারো কারো স্তন কেটে নেয়া হত,হাসতে হাসতে যোনিপথে ঢুকিয়ে দেওয়া হত লাঠি এবং রাইফেলের নল।কোন কোন সৈনিক উঁচু চেয়ারে দাঁড়িয়ে উলঙ্গ মেয়েদের বুকে দাঁত লাগিয়ে মাংস ছিড়ে নিয়ে উল্লাসে ফেটে পড়ত,কোন মেয়ে প্রতিবাদ করতে গেলে তখনই হত্যা করা হত।কোন কোন মেয়ের সামনের দাঁত ছিল না,ঠোঁটের দু’দিকের মাংস কামড়ে ছিড়ে নেয়া হয়েছিল,প্রতিটি মেয়ের হাতের আঙ্গুল ভেঙ্গে থেতলে গিয়েছিল লাঠি আর রডের পিটুনিতে।কোন অবস্থাতেই তাঁদের হাত ও পায়ের বাঁধন খুলে দেয়া হত না,অনেকেই মারা গেছে ঝুলন্ত অবস্থায়।”

মহান মুক্তিযুদ্ধের অনেক পরে জন্ম নেয়া এই প্রজন্ম জানুক একাত্তরে সে সব নারীদের কষ্ট গাঁথা..হৃদয় দিয়ে অনুভব করুক তাঁদের নির্যাতিত হবার যন্ত্রনা। ওই সময়ের সাহসী নারীদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধায় মাথা নুয়ে আসুক আমাদের। সঠিক ইতিহাসের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠুক ৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধে আমাদের দেশের নারীদের অবদান। হানাদার আর রাজাকারদের দ্বারা অমানুষিক নির্যাতনের শিকার তাদের পবিত্র শরীরের প্রতিটি কোষ সেই সময় অস্ফুট ভাষায় এদেশের মুক্তি কামনা করেছিল। আমরা যদি হাতের কাছে পেয়েও রাজাকার নামক ওই নর্দমার কীটগুলোর বিচার নিশ্চিত না করি তবে তাঁদের নির্যাতিত হবার সেই মুহূর্তের আর্তনাদ থেকে আমরা কোনদিন মুক্তি পাব না।

তথ্য ও ছবি সুত্র:
। দৈনিক জনকন্ঠ
2। যুদ্ধ ও নারী, লেখক ডা. এম এ হাসান
3। সানডে টাইমস
4। উইকিপিডিয়া
5। মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়
6। মুক্তিযুদ্ধে নারী বিষয়ক বিভিন্ন আর্টিকেল