ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

১৯৭১ সালে প্রিয় এই দেশকে স্বাধীন করার জন্য যারা নিজের জীবন, সংসার, আপনজন কোনও কিছুর পরোয়া না করে দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করেছেন, ছিনিয়ে এনেছেন বিজয়, আমরা তাঁদের সেদিনের সেই অবদান আজীবন কৃতজ্ঞতা ভরে স্মরণ করি, তাঁদের জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বলে স্বীকৃতি দেই। কিন্ত একাত্তরের সেই সূর্য সন্তান, সেদিনের একজন মুক্তিযোদ্ধা যখন নোংরা রাজনীতির ময়দানে দেশ স্বাধীনের আদর্শ জলাঞ্জলি দিয়ে স্বার্থ এবং হিংসার খেলায় মত্ত হয়ে উঠেন, তখন স্বাধীন দেশের নাগরিক হয়ে তাদের কর্মকাণ্ডে ভীষণ লজ্জিত হই আমরা।

আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের কাণ্ডারিদের যখন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্ব করতে দেখি, তাদের একাত্তরের চেহারার সাথে বর্তমান চেহারার অমিল আমাদের ভীষণ ব্যথিত করে। রাজনৈতিক দলের নেতা হয়ে সেদিনের মুক্তিযোদ্ধারা আজ নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় অসহায় জনগণের কথা ভুলে গেছেন। তাদের সেদিনের দেশপ্রেমের সাথে এখনের দেশপ্রেমের যেন যোজন যোজন তফাত পরিলক্ষিত হয়।!!!মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বিসর্জন দিয়ে নিজের সুবিধা অসুবিধা বুঝেই তারা তাদের আদর্শ বদলে ফেলেন মুহূর্তেই..নিজেদের থু থু গিলে ফেলার মতই আজ যার সমালোচনা করে মূখে ফেনা উঠিয়েছেন, কাল তার পাশে বসে তারই মেকি প্রশংসায় স্বার্থ উদ্ধারের জঘন্য খেলায় মত্ত হতে দেখি আমরা। একাত্তরে যেই রাজাকারদের দ্বারা নিজেদের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়েছিল, যাদের বিশ্বাসঘাতক কর্মকাণ্ডে স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হবার উপক্রম হয়েছিল, কিভাবে আজ সেই মুক্তিযোদ্ধারা সেই সব ভুলে তাদের সাথেই দেশ ধ্বংসের নীল নকশা আঁকতে পারেন, তা দেখে আমরা বিস্মিত হবার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলি যেন!!!!!

একজন মুক্তিযোদ্ধা যখন দেশ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে রাজনীতিতে আসেন, তখন জনগণের জন্য এর থেকে খুশির বার্তা আর কিছুই হতে পারে না..মুক্তিযোদ্ধা মানেই আমাদের কাছে নির্লোভ এক চরিত্র..যে নিজের জীবনকে তুচ্ছ মনে করে, যার কাছে সংসারের থেকেও বড় হল দেশের কোটি কোটি মানুষের স্বার্থ রক্ষা। কিন্তু সময়ের আবর্তনে যখন সেই মুক্তিযোদ্ধাদের ভিন্নরূপ দেখি, যখন রাতারাতি তাদের সম্পদের পাহাড় গড়ে উঠতে দেখি, ভেবে নিতে কষ্ট হলেও মেনে নিতে বাধ্য হই যে, একদিন তারাই এই দেশটাকে স্বাধীন করেছিল। কাজেই দেশের অর্থ সম্পদের একমাত্র অধিকারী তারাই এবং তাদের বংশধরেরাই।কিন্তু মুষ্টিমেয় কিছু মুক্তিযোদ্ধা যখন সম্পদের পাহাড় গড়ে, তখন অনেক মুক্তিযোদ্ধরা অনেক ভাবে অবহেলিত থাকেন, এমনকি ভিক্ষাবৃত্তি করেও দিনানিপাত করছেন। আর এই অবহেলিত মুক্তিযোদ্ধাদের এই অবহেলা এবং দুর্দশার জীবনের পিছনেও থাকে সেদিনের সেই কোনও না কোনও বীর মুক্তিযোদ্ধাদেরই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অবদান!!দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক দলে একজন মুক্তিযোদ্ধা যোগদান করতেই পারেন। কিন্তু একটি জাতির জন্য লজ্জার বিষয় হয় তখনই যখন ক্ষমতা পাল্টানোর সাথে সাথে পাল্টে যায় মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা, পাল্টে যায় প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার নাম, রাজাকার অন্তর্ভুক্ত হয় মুক্তিযোদ্ধার সেই তালিকায়!!

আশ্চর্য হলেও সত্যি প্রধান দলগুলোর ভিতর প্রধান তোষামোদকারীদের মাঝেই আছেন আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা। ভিন্ন ভিন্ন দলে থেকে একে অপরের প্রতি কালি ছোঁড়াছুঁড়ি করে তারা মুক্তিযুদ্ধে তাদের নিজেদের অবদানকেই কালিমা লেপন করছেন। দলীয় মতভেদ তো থাকতেই পারে, কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের অভাব সত্যি দুঃখজনক। দুঃখ হয় যখন দেখি রাজনীতির ময়দানে আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা একে অপরকে অনেক কুরুচিপূর্ণ কথা বলে আক্রমণ করেন, কষ্ট হয় যখন দেখি, তারা যে দেশ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে যুদ্ধ করেছিলেন সেই স্বপ্নকে প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ পেয়েও সংসদে না গিয়ে বেতন ভাতা দিয়ে আয়েশ করেন। অসহায় মানুষের জন্য কিছু করার অঙ্গীকার করে ভোট বাগিয়ে যখন তারা তা বেমালুম ভুলে যান..কষ্ট হয় তাদের নৈতিক অধঃপতন দেখে।

কষ্ট হয় যখন মহান মুক্তিযুদ্ধের অবিস্মরণীয় পুরুষের অবদানকে ব্যঙ্গ করার জন্য আড়ম্বরপূর্ণ মিথ্যা জন্মদিন পালন করা হয়। কষ্ট হয় যখন দেখি সেই জন্মদিন উদযাপনে বঙ্গবন্ধুর পাশে থেকে যুদ্ধ করা সেদিনের মুক্তিযোদ্ধারাও বয়সের মাপে ওজনদার কেক কাটার মচ্ছবে নির্লজ্জের মত সামিল হন।

কষ্ট হয় যখন দেখি মহান মুক্তিযুদ্ধের অগ্রগামী বীরের কন্যা রাজাকারদের সাথে হাসি মুখে এক মঞ্চে বসে ক্ষমতায় যাবার স্বপ্নে বিভোর হন। হতভম্ব হতে হয় যখন দেখি নিজেদের নামে বঙ্গবভনের মতো জাতীয় সম্পদ লিখে নেয়ার চিন্তাকে বাস্তবে রূপান্তর করার প্রচেষ্টা করা হয়।

যে মুক্তিযোদ্ধারা দেশকে নিজের জীবনবাজি রেখে মুক্ত করেছেন, কষ্ট হয় যখন দেখি তারা এবং তাদের বংশধরেরা সেই দেশের অর্থ বিদেশে পাচার করে, দেশের সার্বভৌমত্বের গোপন তথ্য তুলে দেয় বিদেশী শত্রুর হাতে।কষ্ট হয় যখন দেখি মুক্তিযুদ্ধের সময় মা-বোনের ইজ্জত রক্ষার জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ সেইসব মুক্তিযোদ্ধাদের দ্বারা মহিলা সংসদ সদস্যরা কুরুচিপূর্ণ বাক্যবানে ধর্ষিতা হন। অবাক হতে হয় যখন বীরবিক্রম খেতাব প্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল (অব) অলি আহমদ মুক্তিযুদ্ধের শহীদের সংখ্যা নিয়ে মিথ্যাচার করেন।

একাত্তরের একদা মুক্তিযোদ্ধা আজকের এই কর্নেল অলি আহমেদ যেন প্রিয় হুমায়ুন আজাদের সেই প্রবচনটিকে পুনরায় জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠিত করলেন, “মুক্তিযোদ্ধা মানে চিরকাল মুক্তিযোদ্ধা নয়”।