ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

 

গতকাল (৮ জানুয়ারী, ২০১৩) বিমান শ্রমিকলীগের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে ডাকা ধর্মঘটে বিপর্যয় ঘটে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রুটের সকল ফ্লাইট সিডিউলের। এর ফলে বাতিলকৃত ফ্লাইটের প্রায় তিন হাজার দেশী বিদেশী যাত্রী অবরুদ্ধ হয়ে অসহনীয় দুর্ভোগ পোহান বিমানের ভিতরে ও বিমানবন্দরে। বিমানের কর্মীদের দাবি পূরণ আন্দোলনে জিম্মি হয় এইসব অসহায় নিরীহ যাত্রী।

পত্রিকা মারফত জানা যায়, সিবিএ ও বিমান শ্রমিকলীগের সভাপতি মশিকুর রহমানের বিরুদ্ধে আনীত বিমান কর্তৃপক্ষের বিভাগীয় মামলা প্রত্যাহারের দাবি প্রধানত এই ধর্মঘটের মূল কারণ। বিমান কর্তৃপক্ষ নাকি শ্রমিকলীগের এই মজলুম (!) নেতাকে শোকজ করে চাকরিচ্যুতির সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বা নিতে যাচ্ছে এই আশংকা থেকে নেতা নিজেই অন্যদের সাথে নিয়ে চাকুরী বাঁচানোর জন্য ধর্মঘট আহবান করেন।আর ত্যাগী(?) সভাপতির মূল্যবান চাকুরী বাঁচানো আন্দোলনকে বেগবান করতে আরও কিছু পুরোনো দাবি যেগুলো নাকি আদতে সমস্যা সংকুল বিমানে কখনোই পূরণ হবে না যেমন, আহার ভাতা ও ইউনিফর্ম, ভারত থেকে আনা বিমানের সেটআপ বাস্তবায়ন, কর্মচারীদের ব্যক্তিগত টিপি বাস্তবায়ন, ১০০ ভাগ চিকিৎসা ভাতা দেয়া এবং ৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে কাজ করা কর্মচারীদের স্থায়ী করার বিষয় আন্দোলনকারিরা জেনেবুঝেও যুক্ত করেন।

নেতার চাকুরী বাঁচানো এই ধর্মঘটের কারণে বিমানবন্দরে সৃষ্টি হয় নজিরবিহীন অরাজকতা। আন্দোলনকারীদের দ্বারা মুহুর্তেই জিম্মি হয়ে পড়েন অসহায় নিরীহ যাত্রীরা।যাদের পয়সায় বিমান চলে, যাদের রক্ত-ঘামে পাঠানো টাকায় দেশ চলে তাদেরকে নিজ দেশেই আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন ও বিমানবন্দরের নিরাপত্তাকর্মীদের দ্বারা বিনা দোষে লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়। বিমানের কর্মীদের নিজস্ব দাবি আদায়ের আন্দোলনের ঘৃণ্য চক্রে দেশে ফিরেও দেশের মাটিতে পা দিতে দেয়া হয় না দীর্ঘদিন পর ফিরে আসা যাত্রীদের, বাইরে অপেক্ষমান স্বজনের মুখ দেখতে দেয়া হয় না, জমিজমা সম্বল বেঁচে পরিবারের সবার মুখে হাসি ফোটানোর এক বুক আশা নিয়ে প্রবাসে পাড়ি দেয়ার স্বপ্নকে অনিশ্চয়তায় ফেলে দেয়া হয়, বাংলাদেশে বেড়াতে আসা বা বেড়ানো শেষে ফিরে যাওয়া বিদেশী যাত্রীদের মনে স্থায়ীভাবে এঁকে দেয়া হয় বাংলাদেশ নামক দুঃস্বপ্ন। আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি অপূরণীয় ক্ষতি হয় আমাদের প্রিয় দেশের ভাবমূর্তির।

সভ্য দেশ থেকে আসা বা সভ্য দেশে যাওয়া এইসব যাত্রীরা তাই সকল সভ্যতা ভুলে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন, একজোট হয়ে চড়াও হন নিরাপত্তাকর্মীদের ওপর, মুহুর্তেই তছনছ করেন কাউন্টারের গ্লাস, টেলিভিশন ও বিভিন্ন আসবাবপত্র, ব্যাপক ভাংচুর করেন বিমানবন্দর অভ্যন্তরে। দেশের অর্থনীতিকে গতিশীল করার জন্য দেশ ছেড়ে প্রবাসে রক্ত পানি করে রেমিটেন্স পাঠানো আমাদের অসহায় শান্ত যাত্রীরা তাই চাকুরী হারানোর আশঙ্কায় ভদ্রতা ভুলে মেতে ওঠেন জাতীয় সম্পদের ভাংচুরের বন্য খেলায়। ক্ষুব্ধ যাত্রীদের তাণ্ডবে দেশী ও বিদেশী যাত্রীরা আতঙ্কিত হয়ে ছোটাছুটি করেন, শিশুদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে বিমানবন্দর, রোগীরা পৌছে যান জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষনে।

বাংলাদেশ বিমানকে ঘিরে নানা সমস্যা অনেক দিন ধরে গুরুত্বহীনভাবে অল্প বিস্তর ছোট করে বিভিন্ন মিডিয়াতে আসছিল। কিন্তু বরাবরের মতই কর্তৃপক্ষের উপেক্ষা, সমস্যা সমাধান না করে তা জিইয়ে রেখে ফাকা আশ্বাস দিয়ে উস্কে দেয়া এবং সব সমস্যা জেনেও দুর্নীতির খনি থেকে অফুরন্ত অবৈধ পয়সা লোটার মানসিকতা থেকে বাংলাদেশ বিমান যেন শ্বেতহস্তিতে পরিণত হয়েছে দীর্ঘকাল থেকে। সরকারী দলের উচ্ছিষ্টভূগী বিমান শ্রমিকলীগের নিয়ন্ত্রণে থাকা বিমান যে কখনো মাথা ফুসে এরকম হিংস্র আকার ধারণ করবে, বিমানবন্দরে যাত্রী হয়রানি, ক্ষুব্ধ জিম্মি কর্তৃক ভাংচুর হবে তা হয়তো সরকার কখনো কল্পনাতেও ভাবেন নি।

বিমানের ব্যবসায় যাদের প্রধান ভূমিকা সেই নিরীহ যাত্রীদের জিম্মি করে একজন নেতার চাকুরী বাঁচানো দাবি আদায়ের প্রচেষ্টা কখনোই কাম্য হতে পারে না। যাত্রীরা বিমানে চড়ে বলেই বিমানের কর্মীরা বেতন ভাতা পান, কয়েক দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে আন্দোলন করার সুযোগ ও শক্তি পান। আজ যদি এক যোগে ভুক্তভোগী যাত্রী সবাই বিমান বর্জন করে, তবে এই বিমান শ্রমিকলিগের সভাপতি তথা সমগ্র বিমানের দফা বাস্তবায়নের প্রয়োজন আর পড়বে না। বিমানের সার্ভিস কেমন তা নিয়ে আর বিস্তারিত আলোচনায় গেলাম না। কিন্তু সে সার্ভিস যে অতি নিম্নমানের তা বলাবাহুল্য। তারপরও মানুষ বিমান ব্যবহার করে দেশপ্রেমের জন্য। বিমান কর্মীদের দেশ-বিদেশে দুর্ব্যবহার সহ্য করেও আমরা যাত্রীরাই বাঁচিয়ে রেখেছি বিমানের নিভু নিভু জীবন প্রদীপ। আর আমাদের রক্ত-ঘামের টাকায় বেতন নিয়ে আপনাদের নেতার চাকুরী বাঁচানোর জন্য আমাদেরকেই জিম্মি করবেন তা হবে না। আমরা যাত্রীরা যদি বিমান ব্যবহার বন্ধ করে দেই তবে অতি শীঘ্রই হাতে হারিকেন নিয়ে চাকুরী খোঁজার মিছিলে সামিল হতে হবে, সে কথাই দাবি আদায়ের লক্ষ্যে সকল আন্দোলনকারীকে স্পষ্ট জানিয়ে দিতে চাই।

**********

তথ্য ও ছবি সুত্র: বিডি নিউজ ২৪, প্রথম আলো, কালের কণ্ঠ, ইত্তেফাক ও গুগল ইমেজ