ক্যাটেগরিঃ নাগরিক আলাপ

পত্রিকার পাতায খবরটা চোখে পড়তেই মনটা বিষন্নতায ভরে গেল। আবারও একটি সম্ভাবনাময় জীবনের অপমৃত্য!!! আবারও দায়ী সেই পুরোনো কারণ, “ইভ টিজিং” । অনেকদিন ধরেই ভাবছিলাম এ নিয়ে কিছু লিখব। খুব কী দেরি হয়ে গেল? মেয়েটা যে মরেই গেল!!!

আজ আমি আমার ব্যক্তিগত একান্ত কিছু কথা আপনাদের সাথে শেয়ার করব। তোমাদের সাথে যারা সর্বদাই “টিজিং” নামক নোংরামির সাথে পথ চলতে বাধ্য হচ্ছ..তাদের জন্য আজ আমি লিখছি। আমি জানি বাংলাদেশ এ এমন কোনও মেয়ে খুজে পাওয়া যাবে না যে জীবনে কখনোই টিজিং এর শিকার হয় নাই!!! সে বোরখার নিচেই থাকুক আর তথাকথিত আধুনিকই হোক। আমিও তার ব্যতিক্রম নই।

মাত্র অনার্স শেষ করে মাস্টার্স এর জন্য তখন আমি ফাইনান্স ডিপার্টমেন্ট এ ভর্তি হয়েছি। কিছুদিন পর জানতে পারলাম ডিপার্টমেন্ট এ শিক্ষক নিয়োগ হবে। দরখাস্ত জমা দিলাম। সব থেকে যোগ্য প্রার্থী হিসেবে সবার আগে আমার নাম শুনতে পেলাম। ভাইভা তখন ও হয় নাই। আর কিছুদিন বাকি আছে। হঠাত্ করেই আবিষ্কার করলাম ক্যাম্পাস যেখানেই যাচ্ছি, ছেলেরা আজেবাজে টিজ করছে। মাথায় ঢুকছে না কেন আমাকে নিয়ে সবাই আজে বাজে কথা বলছে। ঘনিষ্ঠ বান্ধবীদের কাছে জানতে পারলাম আমি যাতে নিয়োগ না পাই, তাই আমাকে নিয়ে হরেক রকম গল্প বানান হচ্ছে..আর এসব টিজিং এর কারণে আমি যাতে ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে যাই , তাই পথে ঘাটে আমাকে হেনস্থা করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। হায় রে পাবলিক। মুখে যা আসে তাই তারা বলা শুরু করল।

সত্যি বলতে কি মানসিকভাবে খুব ভেঙে পড়েছিলাম। নির্ঘুম রাত কাটিয়েছি। হল এর ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে মরার চিন্তা ও যে মাথায় আসে নাই..বললে মিথ্যা বলা হবে। কিন্তু ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখেছি আমার আত্মহত্যা কী এর সঠিক সমাধান? আমি মরলে এদের কী? কিন্তু আবার বাবা-মা যারা এত আশা নিয়ে আমাকে বড় করেছেন, ওদের কী হবে? আমি নিজেকে বদলাতে শুরু করলাম। আগের মত ক্লাস, লাইব্রেরী, অডিটরিয়াম, ক্যাম্পাস চত্বরের সবখানে যাওয়া শুরু করলাম। নোংরা কথা গুলো এক কান দিয়ে শুনে অন্য কান দিয়ে বের করে দিতাম। ভিতরে ভিতরে পুড়ে গেলেও বাইরে থেকে এত শক্ত থাকতাম যে বদমাশগুলো টিজ করে তেমন মজা পেত না। আমার নিস্পৃহতা ওদের উত্সাহে পানি ঢেলে দিয়ে ছিল বোধ হয়। আমি মুখোমুখি ওদের কখনোই প্রতিবাদ করি নাই। আমার মতে প্রতিবাদ করা মানে ওদের আরও উস্কে দেয়া। আমার নিস্পৃহতা ছিল আমার সরব প্রতিবাদ।

বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকুরীটা আমি পেয়েছিলাম। মাথা উচু করে সেদিনও যেমন ক্যাম্পাস এর সবুজ চত্বরে বেরিয়েছে..এখন ও বেরোই। জঘন্য “রিউমার” আমাকে থমকে দেয় নাই। থমকে দিতে আমি দেই নাই।

তাই মেয়েরা তোমাদের বলছি, নোংরা কথা নোংরা লোকেরা বলবেই। আত্মহত্যার মত ভুল সিদ্ধান্ত এর কোনও সমাধান নয়। কে কী বলে বলুক, তুমি শক্ত হয়ে পথ চল। মাথা উচু করে হেটে যাও। ওদের পচা কথায় কষ্ট পাচ্ছ? বুঝতে দিও না। তোমাকে টুকরো টুকরো করে ভাঙ্গাইতো ওদের লক্ষ্য। তুমি যখন নির্বিকার থাকবে, ওরা এম্নিতেই দেখবে একদিন উত্সাহ হারিয়ে চুপটি মেরে যাবে। আর তুমি তোমার পড়াশুনা মন দাও। ছোট্ট শহর থেকে ভাল রেজাল্ট করে বড় শহরে চলে এস। তারপর পৃথিবীর আরও বড় কোনও শহরে। অমূল্য এই জীবনটাকে তুমি গড়ে তোল তোমার মেধা দিয়ে, তোমার কর্মগুণে।

পিছু ফিরে দেখতে পাবে, নোংরা ছেলে গুলো এখন ও গলির মুখে, স্কুল কলেজ এর সামনে দাড়িয়ে আছে। ঠিক আগের মত। তবে আর ও নোংরা হয়ে। এবার তারা টিজ করছে তোমার ভাই বা বোন এর মেয়েটিকে। কিংবা আরও পরে ফুটফুটে তোমার মেয়েটিকে। ওরা কখনোই বদলাবে না। কিন্তু তুমি তো তোমার জীবনটাকে বদলে দিতে পারো । দরকার শুধু তোমার ইচ্ছা শক্তি আর সাহসিকতার। রাস্তার নোংরা ছেলেগুলো থাক না রাস্তায় পড়ে, তুমি ভয় না পেয়ে এগিয়ে যাও, অনেক দূরে, সাফল্যের শিখরে।