ক্যাটেগরিঃ নাগরিক আলাপ

প্রকৃতি ও জীবনের সূত্র দিয়ে শুরু করব।
প্রকৃতির ১ম সূত্রঃ
প্রকৃতির সব আয়োজন প্রাণকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য।
(Survival is the first law of nature)

জীবনের ১ম সূত্র:
সুখী হওয়া ছাড়া আমাদের জীবনে অন্য কোন লক্ষ্য নাই।
(Happiness is the first law of life.)

সূত্রগুলোর ব্যাখ্যা আপাদত জরুরি না, তবে আমার লেখার বিষয়বস্তুর গুরুত্ব অনুধাবন করার জন্য প্রথম উল্লেখ করা সূত্রটির পুনরাবৃত্তি প্রয়োজন। বেঁচে থাকাই প্রকৃতির প্রধান বিধান আর এ কারণেই মৃত্যুতে আমাদের এতো ভয়। জীবনকে বাঁচানোর ও মরণকে ঠেকানোর উপায় জানানো এ লেখার উদ্দেশ্য না। এ লেখার মূল উদ্দেশ্য অপ্রত্যাশিত মৃত্যু ও দুর্ঘটনার হার কমানোর জন্য আমরা কি করতে পারি তা আলোকপাত করা। এটা করতে যেয়ে আমি স্বজ্ঞানে প্রিয় পাঠকদের কিছু অপরিহার্য উপদেশ দিয়ে ফেলব। আমার উপদেশ যদি একজনকে সমূহ বিপদ থেকে রক্ষা করে তাহলে আমি নিজেকে গুটিয়ে রাখার প্রয়োজন বোধ করি না। এবার মূল প্রসঙ্গে আসি।

মানুষকে শুধু নির্দেশনা দিলেই হয় না, নির্দেশনাটা মেনে চলার জন্য বাধ্য করতে হয়। ভদ্রলোকদের বাধ্য করা যায় পুরষ্কারের লোভ দেখিয়ে, অভদ্রলোকদের বাধ্য করা যায় শাস্তির ভয় দেখিয়ে। প্রকৃতি কারন ছাড়া কিছু ঘটায় না, মানুষ লক্ষ্য ছাড়া কিছু করে না। কাজের জন্য অনুপ্রেরণা বা মোটিভেশন না থাকলে কোন ব্যক্তিই কোন কিছু করে না। এখন যদি আমি বানী প্রকাশ করি, “ হে বাংলার মানুষ! তোমরা তোমাদের মানসিকতাকে নিরাপদে চলার উপযোগী কর “, তাহলে আমি জানি এ বানী সবাই শুনবে কিন্তু মেনে চলবে না কেউ। কিন্তু এখানে যদি অর্থনীতি আনি তাহলে অনেকেই এটাতে আগ্রহী হবে। অর্থের চেয়ে মানুষের কাছে জীবনের মূল্য বেশি, তাই আমি যদি দেখাতে পারি নিরাপদে চলার মানসিকতা জীবনকে সমৃদ্ধ ও সুদীর্ঘ করবে তাহলে অনুমান করি অনেকেই তা মেনে চলবে।

‘কিভাবে নিরাপদে থাকা যায়’ তা মানুষের কাছে চিত্তাকর্ষক না, ‘নিরাপদে থাকলে কি লাভ’ তা চিত্তাকর্ষক। তাই দ্বিতীয় বিষয়টা দিয়ে শুরু করব।

নিরাপদে থাকার লাভঃ
১।আপনাকে ও আপনার স্বজনদের অপ্রত্যাশিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করবে।
২। মর্মান্তিক অঙ্গহানি থেকে রক্ষা করবে।
৩। দুর্ঘটনাজনিত চিকিৎসা ব্যয় সংকোচন করবে।
৪। প্রিয়জন হারিয়ে যাওয়ায় সৃষ্ট মানসিক কষ্ট থেকে রক্ষা করবে।
৫। সময়কে অসহনীয় ও মনকে উদ্বিগ্ন করা থেকে রক্ষা করবে।
৬। বড় অর্থনৈতিক ক্ষতি (যেমন দুর্ঘটনায় আহত হয়ে দীর্ঘকাল ছুটিতে যাওয়ায় চাকুরি হারানো) থেকে রক্ষা করবে।
৭। ব্যক্তিগত সম্পর্কগুলোকে ক্ষতিগ্রস্থ হওয়া থেকে রক্ষা করবে।
৮। সম্পদ নষ্ট ও হ্রাস পাওয়া কমাবে।
৯। জীবনে সুখ-শান্তির পথকে প্রশস্ত করবে।

উপরের ঘটনাগুলো যে কতটা মর্মান্তিক তা যদি ১০০ পৃষ্ঠার কাগজে ব্যাখ্যা করি তাহলে একজন মানুষ সে কাগজগুলো পড়ে যতটুকু না বুঝতে পারবে তার চেয়ে ১০০ গুন বেশি বুঝতে পারবে যদি সে তেমন কোন অভিজ্ঞতা ব্যক্তি জীবনে লাভ করে। জীবনের পাঠশালায় অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আমরা যা দেখি তাই আমরা শিখি ও মনে রাখি (বাকী সব ভুলে যাই)। তবে সব কিছু জানা ও মনে রাখা অপ্রয়োজনীয় ও ক্ষতিকর। তাই উপরের ৯টি বিষয়ে আমরা অনভিজ্ঞ থাকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।

এবার প্রিয় পাঠককে বলব কিছু উপদেশ ও একাধিক নীতিকথা শোনার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত হতে।

আপনার করণীয়:

১।কখনো গাড়ি চালানোর সময় অথবা রাস্তায় হাঁটার সময় মোবাইল ফোনে কথা বলবেন না।
২।গাড়ির গতিবেগ সীমিত রাখুন।চলন্ত যানবাহনে শরীরের কোন অঙ্গ বাইরে রাখবেন না।
৩।‘রাস্তায় পথচারীর সম্মান সর্বোচচ’ কথাটা অন্য কোন দেশে ব গ্রহে সত্য হতে পারে, তবে বাংলাদেশে এ কথাটাকে মিথ্যা ভাবুন।
৪।অগ্নিকান্ড ও ভূমিকম্পের জন্য প্রস্তুত থাকুন এবং এই দুর্যোগ মোকাবেলার মূল বিষয়গুলো জেনে রাখুন।
৫।রান্না শেষে গ্যাসের চুলা জ্বালিয়ে রাখবেন না। (চুলাকে চুলার কাজ ছাড়া অন্য কাজে ব্যাবহার করা কঠোর ভাবে এড়িয়ে চলুন।)
৬।প্রয়োজন না হলে লাইট, ফ্যান, টেলিভিশন ও কম্পিউটার ইত্যাদির সুইচ অন করে রাখবেন না। ( দীর্ঘ দিনের জন্য বাসার বাইরে গেলে প্রধান সুইচ অবশ্যই অফ করে রাখবেন।)
৭।বাসা বাড়িতে খালি পায়ে কখনো বৈদ্যুতিক লাইনে কাজ করবেন না। (ভেজা কাপড় এড়িয়ে চলুন।)
৮।ছুরি, কাচি,দা, যাঁতি,ব্লেড, করাত ও ভোমর ইত্যাদি ব্যবহারে সতর্ক হন। ( নগ্ন ছুরি, ব্লেড শিশুদের নাগালের অনেক বাইরে রাখুন।)
৯। অসহনীয় তাপ, কম আলো, উচ্চ শব্দ পরিহার করুন।
১০।ইস্ত্রি, গরম পানি, গরম হাড়ি-পাতিল ও জ্বলন্ত মোমেবাতির ব্যাপারে সতর্ক থাকুন।
১১।ধারল প্রান্ত, ঘূর্ণায়মান বস্তু ( যেমন ফ্যান, ড্রিল মেশিন ইত্যাদি) ও চলন্ত বস্তুর( রিক্সা, গাড়ি ইত্যাদি) ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করুন।
১২।জলাশয় ভ্রমণে সতর্ক থাকুন। সাতার জানা না থাকলে জেনে নিন। (খুব কম খরচে এমন কি বিনা খরচে সাতার শেখা যায়)।
১৩।হেন্ড-রেইল ছাড়া সিঁড়ি ও রেলিং ছাড়া ছাদ পরিহার করুন।
১৪।অন্ধকার, নির্জনতা, গভীর রাত এড়িয়ে চলুন।(দিনের আলোকে প্রাধান্য দিন)।

যে ৯টি লাভ ও ১৪টি করণীয়ের তালিকা দিয়েছি, সেগুলোর যদি দীর্ঘ ব্যাখ্যা দেই তাহলে তা পাঠকের বিরক্তির বড় কারণ হয়ে দাড়াবে। তাই এই ২৩টি বিষয়ের বিশদ ব্যাখ্যা না দিয়ে আপাদত শুধু প্রথম বিষয়টার সামান্য ব্যাখ্যা দেব। এবং পরবর্তীতে এ বিষয়ে লেখা অব্যাহত রাখব।

পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি ঘটা দুর্ঘটনাগুলোর একটি হলো রোড-এক্সিডেন্ট। সমীক্ষায় দেখা গেছে ৯৩% রোড-এক্সিডেন্ট হয় চালকের মানবিক ত্রুটির কারণে। এবং লক্ষ্যনীয়, এই চালকদের প্রায় কেউ-ই বুঝে না বা স্বীকার করে না যে দুর্ঘটনাটা তাদের ভুলের কারণে ঘটেছে। মানবিক ত্রুটির মধ্যে প্রথম সারিতে আছে মোবাইল ফোনে কথা বলা। ২৮% সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে চালকের মোবাইল ফোনে কথা বলা ও টেক্ট মেসেজ পাঠানোর কারণে।

রাস্তা পারাপারে ও গাড়ি চালনায় সতর্কতা অবলম্বন অপরিহার্য। অসুস্থ হলে জীবনমরণের মাঝে ব্যাবধান থাকে দিন, সপ্তাহ অথবা মাস, কিন্তু রাজপথে অসাবধানে গাড়ি চালালে জীবন আর মরণের মাঝে পথের দূরত্ব থাকে সর্বোচ্চ ৩ সেকেন্ড। অসচেতন, অশিক্ষিত ও জীবনের প্রতি দরদহীন গাড়ি চালক দুর্ধষ ডাকাতের চেয়েও অনেক বেশি অনিরাপদ মানুষ।

আহবানঃ
সামান্য সচেতনতা, পূর্বপ্রস্তুতি ও প্রতিরোধ, অসামান্য ক্ষতি ও অসুবিধাকে রোধ করে। ভাগ্য আমাদের বাঁচায় একবার, কিন্তু নিরাপদে চলার মানসিকতা ও সচেতনতা আমাদের রক্ষা করে বার বার। সুতরাং আসুন, আমরা আমাদের ব্যক্তিগত ও জাতীয় স্বার্থে আমাদের মানসিকতার পরিমার্জন ঘটাই। (এ লক্ষ্যে কোন কর্তৃপক্ষের উপর নির্ভরশীল হতে গেলে দীর্ঘসূত্রিতা ও জটিলতার গোলক ধাঁধাঁ পড়ে যাবার সম্ভাবনা আছে)। এগিয়ে যাবার জন্য আলাদা আলাদাভাবে একক ব্যক্তির ব্যক্তিগত আংশগ্রহণই যথেষ্ট। আমরা সবাই যদি পৃথক পৃথকভাবে সচেতন ও সুন্দর হই, দিন শেষে দেখা যাবে পুরো সমাজটাই উন্নত হয়ে গেছে।

অবশেষ মন্ত্রপাঠঃ
মানুষ নগদ চায়। সুতরাং নতুনের ডাকে তারা সাড়া দেবে না-তা আমি জানি। তাতে আমি বিচলিত নই। কারণ আমার প্রিয় রবি ঠাকুর আমরা যারা ভালোবাসাবাদী তাদের অন্তরে এগিয়ে চলার মন্ত্র সুকৌশলে বপন করে গেছেন এবং বলে গেছেন,” যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে……।“

২৯-আগষ্ট-২০১২
ধানমন্ডি, ঢাকা

তথ্যসূত্রঃ
http://www.washingtonpost.com/wp-dyn/content/article/2010/01/12/AR2010011202218.html
http://en.wikipedia.org/wiki/Traffic_collision#Human_factors