ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

পৃথিবীটা যদি বেহেস্ত হতো তাহলে ভালোবাসার বিনিময়ে এখানে সব সময় শুধু ভালোবাসাই পাওয়া যেত। বাস্তবে পৃথিবীটা স্বর্গ থেকে বিতারিত মানুষগুলোর ক্ষণস্থায়ী সংশোধনাগার। এখানে ভালোবাসার বিনিময়ে ভালোবাসা অনিশ্চিত, ভালোবাসার বিনিময়ে ঘৃণা প্রচলিত এবং ঘৃণার বিনিময়ে ঘৃণা অবধারিত। আজ এই মুহূর্তে আমার অন্তরের সবটুকু ঘৃণা নিকৃষ্ট চলচ্চিত্রটির জন্য। এর পরিচালকের সাথে আমার যখন প্রথম সাক্ষাৎ হবে তখন করমর্দনের আগে আমি বিবেচনা করে দেখব, জনতার বাম হাতের চপেটাঘাত খাওয়ার জন্য তার ডান গালটা যথেষ্ট পবিত্র কি-না!

আমি যতটুকু বুঝি তাতে বলতে পারি, একটি চলচ্চিত্রের তিনটি উদ্দেশ্য থাকতে পারে।
#১: সত্য প্রকাশ
#২: অর্থ উপার্জন
#৩: শিল্পচর্চা

ধনীর সম্পদের উপর যেমন গরীবের অধিকার আছে তেমনি শিক্ষিত লোকের জ্ঞান-গরিমার উপর নির্বোধদের অধিকার আছে। চতুষ্পদী পরিচালকটির জন্য আমি আমার সীমাবদ্ধ জ্ঞানের সব’কটি জানালা উন্মুক্ত রাখব। এখন আমি পরবর্তী ৩ অনুচ্ছেদে পরিচালক সাহেবটাকে মুক্তহস্তে জ্ঞান বিতরণ করব। (উপরে উল্লেখ করা ৩টি উদ্দেশ্যকে আমি আমার লেখার সার্বক্ষণিক গাইডের ভূমিকা পালনের সুযোগ দেব।)

#১: সত্য প্রকাশঃ
আপনি সত্য প্রকাশ করতে চান? প্রকাশ করুন, আমরা কি আপনাকে মানা করেছি? পৃথিবীতে এখন আর দাস-দাসীর অভাব নাই- এই সত্য প্রকাশ করুন। পৃথিবীর ৯০% সম্পদ ১০% ধনীদের দখলে। ৯০% দরিদ্র মানুষ সারাটা জীবন দাস থেকে যায় বাকী ১০% মানুষের। ৯০% মানুষ বেঁচে থাকার বাধ্যবাধকতার কারণে সারা জীবন সম্পদশালী ১০% মানুষের কাছে নিজেদের ছোট বড় সবগুলো সুখ বিক্রি করে দেয়। গরীবের বিক্রি করা সুখ পেয়ে বড়লোকদের মহাসুখী হবার কথা, কিন্তু বাস্তবে কেউ সুখী না। এতক্ষণ আপনি যে সত্যটুকু জানলেন সেটাকে ভিত্তি করে যদি আপনি একটি শৈল্পিক চলচ্চিত্র নির্মান করেন তাহলে আপনি ১০০% নিশ্চিত থাকতে পারেন পরবর্তী অস্কারটা আপনি পাচ্ছেন।

#২: অর্থ উপার্জনঃ
ভিন্নধারার চলচ্চিত্র নির্মাণ করে আপনি যদি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হন তাহলে আপনার জন্য আমার বিকল্প চিন্তা আছে এবং তা আপনার জন্য হবে খুব-ই অর্থকরী।
আপনার সুস্থধারার চলচ্চিত্র যদি দর্শকরা গ্রহণ না করে(অর্থাৎ না খায়), আপনি প্রেমের গল্প নির্ভর চলচ্চিত্র নির্মাণ করুন। দেখবেন দর্শক হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। আর আপনি যদি রোমান্টিক চলচ্চিত্র নির্মানের জন্য যথেষ্ট সৃজনশীল না হন, তাহলে আদিকালের এক রঙে রঙিন ৩ মাত্রার রসালো একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করুন। দেখবেন অল্প প্রযুক্তিতে স্বল্প বাজেটে বিশাল মুনাফা করেছেন। সিনেমাটিকে সবাই খারাপ চোখে দেখবে, কিন্তু রুদ্ধদার হয়ে দেখবে ঠিক-ই সবাই। দেখার পর কেউ সংঘাতে জড়াবে না। এক রঙে রঙিন সিনেমা অবশ্যই প্রশংসনীয় না, কিন্তু আপনি তিন রঙে রঙিন যে ছবি বানিয়েছেন তার চেয়ে তা হাজারগুণ কল্যাণকর। তা ব্যক্তির দেহমনকে অস্থির করে কিন্তু পৃথিবীর মানুষকে অশান্ত করে না।

#৩: শিল্পচর্চাঃ
শিল্পচর্চা যে আপনার উদ্দেশ্য না তা আপনার বিতর্ক সৃষ্টির প্রবণতা দেখে বুঝা যায়। আমি সব বনেই মুক্তা ছড়াই কিন্তু উলু বনে মুক্তা ছড়াই না। তাই এ বিষয়ে আপনার জন্য কোন পরামর্শ নাই।

চিত্র পরিচালকের রূপঃ
আমি আমার এক শুভাকাঙ্ক্ষী বন্ধুকে জিজ্ঞেস করেছিলাম অন্তত ৪০টি প্রাণের চলে যাওয়ায় যার ভূমিকা প্রধান, সে ব্যক্তিটি মানুষ না অমানুষ? আমার এই বন্ধুটি উত্তর দিল, “ব্যক্তিটার দেহটা মানুষের কিন্তু দেহের শীর্ষে অবস্থান করা মস্তিষ্কটা লেজকাটা গিরগিটির। পৃথিবীর বড় বড় মাথাগুলো বড় বড় সাইকোপ্যাথ। সুযোগ হলে এগুলোকে ট্রায়াল ছাড়াই যাবজ্জীবনের কারাদণ্ডে প্রতিদিন দু’বার করে ইলেক্ট্রিক শকের ব্যবস্থা করব। “

কিছু সোজা কথাঃ
পৃথিবীর সবগুলো মানুষ কষ্টকে বুকে নিয়ে সারা জীবন কাটায় শুধুমাত্র সুখের আশায়। প্রিয় রবি ঠাকুরের ভাষ্য মতে ‘ আমরণ দুঃখের তপস্যা এ জীবন’। মরণটা আসার আগ মুহূর্তেও আমরা সুখটাকে স্পর্শ করতে পারি না। তাই বলে সুখী হবার চেষ্টা অন্যায় কিংবা নিরর্থক না। পৃথিবীটা স্বর্গ না তাই আমরা সুখী না। কিন্তু স্বর্গের কিছু কিছু বিষয় এই পৃথিবীতেও আছে। সেই বিষয়গুলো চর্চা করে আমরা এ পৃথিবীতে স্বর্গের প্রধান কিছু সুখের আভাস পেতে সক্ষম। আমরা সুখী হই ভালোবেসে, সৃষ্টি করে এবং বিশ্বাস করে। ভালোবাসায় অনেক সুখ, বিশ্বাসে তার চেয়েও বেশি সুখ( তা সত্যিই হোক আর মিথ্যা হোক), আর বিশ্বাস যেখানে নাই ভালোবাসাও সেখানে পলাতক। যারা দুঃখী কিংবা মানুষ হিসাবে সভ্য তারা জানা বা অজানাকে বিশ্বাস করে ধূলির পৃথিবীতেও অনেক ভালো থাকে।

আমি পৃথিবীর মানুষগুলোকে বেকসুর খালাস দেব, কিন্তু নির্বোধ পরিচালককে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই কারাগারে পাঠাব। তার অপরাধ প্রমাণিত। পৃথিবীর মানুষগুলোর অপরাধ আমলে নেব না, কেননা তারা যারা সুখীদের দলে তাদের ষড়যন্ত্রের শিকার। পৃথিবীর মানুষগুলোর কিছু আবেগ কিছু বিশ্বাস এবং কিছু ভালো লাগা থাকে। এগুলো নিয়েই তারা সুখে-দুঃখে সময় কাটায় এ জীবনে না পাওয়াগুলো আগামী জীবনে পাওয়ার আশায়। এখন এই বিশ্বাসগুলো যদি ভাঙচুর হয়, ভালো লাগাগুলো যদি চুরমার হয়, আবেগগুলো যদি ছিন্নভিন্ন হয় তাহলে অতি স্বাভাবিক কারণে মানুষগুলো বিধ্বংসী হয়।

সবচেয়ে শান্তির ধর্ম ইসলাম সারা বিশ্বে এখন সন্ত্রাসীদের সবচেয়ে বড় ধর্ম হিসেবে পরিচিত। এটা কি দুঃখীদের বিরুদ্ধে সুখীদের ষড়যন্ত্র, না কি সত্যের বিরুদ্ধে মিথ্যার জয়? আমারতো মনে হয় এটা সভ্যদের বিরুদ্ধে অসভ্যদের নিষ্ঠুর মিথ্যাচার।

জনাব চিত্র পরিচালক,
বুঝলাম, আপনি সৃজনশীল; আপনি চলচ্চিত্র নির্মাণ করে জগৎ পাল্টে দিতে চান, ভালো কথা। আপনার কি বিষয়ের অভাব পড়েছে? পৃথিবীতে আকাশ আছে, বৃষ্টি আছে, ভালোবাসা আছে, এমন কি মায়াবতী নারী আছে। এই ক’টা বিষয়ের যে কোন একটা বিষয় নিয়ে সিনেমা বানালেই তো হিটটা হয় দুর্দান্ত, টাকাটাও ইনকাম হয় প্রচুর। সংঘাতী বিষয় নিয়ে সিনেমা বানিয়ে কি লাভ হলো? প্রাণ গেল, পৃথিবীটা অসুন্দর হল। আপনাকে আত্মগোপনে যেতে হল।
কত দিন সুখে থাকবেন আত্মগোপনে?

প্রিয় পৃথিবীবাসী,
যে যার জ্ঞান, জন্ম ও বিশ্বাস অনুযায়ী ধর্ম বেছে নিক। কোন ধর্ম তো তাতে কোন বাধ সাধছে না। যদি আপনার ধর্মকে সবচেয়ে সত্য জানেন তাহলে সত্যের অনুসারী হবার সৌভাগ্য ও সুযোগ পাওয়ায় গর্বিত ও কৃতজ্ঞ হন। আর যারা মিথ্যার অনুসারী তাদের প্রতি সদয় হন এই ভেবে যে করুণাময় তাদের সত্যের সৌন্দর্য দেখার সৌভাগ্য দেয় নি।

আপনার দয়ার মন যদি মিথ্যার অনুসারীদের সত্যটুকু জানাতে আগ্রহী করে তাহলে তা তাকে জানান। জানানোর পরও যদি তার দৃষ্টি না খোলে তাহলে তাকে হত্যা করবেন না। শুধু অপেক্ষা করবেন প্রলয়ের দিনটির জন্য। সেদিনের পর সবার ধর্ম এক। শেষ বিচারের উন্মুক্ত প্রান্তরে আমরা সেদিন সবাই নগ্ন। চরম নগ্ন। দেহের নগ্নতা সেদিন গৌণ, মনের নগ্নতা সেদিন মূখ্য ও প্রকাশ্য। মনের ভিতরের মিথ্যা, পাপ আর হিংসা কোন কিছুই সেদিন আর লুকিয়ে বা ঢেকে রাখা যাবে না। কর্মই সেদিন জীবনের শেষ ফলাফল নির্ধারক একমাত্র ধর্ম।

পৃথিবীটা আসা আর যাওয়ার। আমরা আসি একা, যাই একা; সাথে নিয়ে যাই শুধু কর্মফল।
২১-সেপ্টেম্বর-২০১২
ধানমন্ডি, ঢাকা।