ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

আমার বন্ধুর নাম সুবাস। প্রথম শ্রেণীর ফাঁকিবাজ একটা মানুষ। তার কর্মস্থলে পৌছাঁনোর কথা সকাল ৯টায়। সে সব সময় সেখানে পৌছায় সাড়ে ৮টার আগে। প্রতিদিন সে তার স্বজনদের অন্তত ৩০ মিনিট সময় কম দেয়।

সে নিজের জীবন থেকে পালিয়ে পালিয়ে বেড়ায়। তবে পৃথিবীর মানুষগুলোকে সে ঠকায় না। [শুধু মাত্র একটি মানুষ (নিজকে) ছাড়া]। এ জন্য সবার সব কিছু হয় কিন্তু তার কিছু হয় না। বড়কর্তাকে সে সব দেয়, বিনিময়ে বড়কর্তা তাকে যা দেয়, তাতে তার সংসার চলে সর্বোচ্চ ১৭ দিন, বাকি দিনগুলো চলে ভালোবাসার গতিজড়তায়। তার জীবনসঙ্গিনী তাকে সব ভালোবাসা দেয়। সে সহযোগী হয়ে এ শহরের সেবাধর্মী একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করে। তাতে যে উপার্জন হয় তা দিয়ে বাকী ১৩ দিন খেয়ে-পড়ে সুখে-দুঃখে দু’জনের ভালোই কেটে যায়।(কোন মাস ৩১ দিনে হলে সেক্ষেত্রে শুধু অসুবিধা হয়।)

হিন্দু হওয়াতে অপরাধ নাই, বৌদ্ধ হওয়াতেও অপরাধ নাই, এমন কি মুসলমান হওয়াতেও অপরাধ নাই, অপরাধ শুধু মানুষ হওয়াতে। মানুষ মাত্রই দুঃখী। গত সপ্তাহে সুবাসের বাবা সুবাসকে পরম দুঃখী করে এ পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন পরপারে।

সুবাসরা যাকে দেখে না তাকে ঈশ্বর বলে পূজা করে না। যে ঈশ্বর মর্তে এসে ধরা দেয় না সে ঈশ্বরকে তারা প্রতিমা বানিয়ে সম্মুখে রেখে পূজা করে। তারা চোখে না দেখে মনে স্থান দেয় না, মেনেও নেয় না। সুবাসের জীবনে প্রচলিত ঈশ্বরগুলো অনুপস্থিত। সারা জীবন দূর্গাকে পূজা করে সুখ হয়নি। সরস্বতীকে পূজা করে শিক্ষা হয়নি। অর্থকরীকেও পূজা করা হয়েছে যথেষ্ঠ; সারা জীবন এর পিছনে ছুটা-ছুটিও করা হয়েছে অনেক। কিন্তু প্রাপ্তি শূন্য। তার কর্ম যতটুকু অর্থকরী সৃষ্টি করেছে তার সবটুকুই তার বড়কর্তা নিয়ে নিয়েছে; তাকে দিয়েছে শুধু ততটুকু যতটুকু পেলে সে বেঁচে থেকে দাস হয়ে মনিবের জন্য অর্থ উৎপাদন করে যেতে পারবে।

আশ্রয় ছাড়া গন্তব্য নাই; ঈশ্বর ছাড়া সুখ নাই। সুবাস নিজের সুখের জন্য লোকালয়ে ঈশ্বর খুঁজে নিয়েছে। হেটে চলা প্রতিটি মানুষ তার কাছে ঈশ্বরের প্রতিমা। সে মানুষকে ভালোবেসে ঈশ্বরকে ভালোবাসার সুখ পায়।

সুবাসের বাবা পৃথিবীর সব মায়া ও পিছুটান ত্যাগ করে পরজগতে চলে গেছেন। সেদিন সুবাস কান্না ভেঁজা চোখে আমাকে জানাল- ‘আমার বাবা ব্রেইন স্ট্রোক করে মারা গেছে। মারা যাবার আগে বাবা কিছু বলে যায় নি’। আমি মৃত্যু সংবাদটা শুনে বলেছিলাম, “ইন্নালিল্লাহে ………রাজিউন। দোয়া করি উনি স্বর্গবাসী হবেন”। এ ধরণের পরিস্থিতিতে আমি সব সময় জান্নাতবাসী হবার শুভেচ্ছা পোষণ করি। কিন্তু চেতন কিংবা অবচেতন কোন একটা মনের খেয়ালে ‘জান্নাত’ শব্দটা ‘স্বর্গ’ শব্দ দিয়ে প্রতিস্থাপিত হয়ে গেছে। সুবাসের বাবা আমার পূর্ব পরিচিত। আমি তার প্রজ্ঞায় মুগ্ধ এবং তার মানব কল্যাণী কর্মকান্ডে আলোকিত। তিনি আমার পরম শ্রদ্ধেয়। বিধর্মী মারা গেলে “ ইন্নালিল্লাহে ………রাজিউন” না বলাটা আমার ধর্মের রীতি এবং আমি এ রীতিটা মেনেও চলি। কিন্তু সুবাসের বাবার ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ঘটে গেল।

বাবার অসুস্থতার বদৌলতে ফাঁকিবাজ সুবাস ১ সপ্তাহ কর্মস্থলে অনুপস্থিত আছে। কালে ভদ্রে হঠাৎ সুবাসের ডাক পরে। যখন ডাক পড়ে সুবাসকে বড়কর্তা প্রায়শ কর্মস্থলে পায় না। গতবার খুব প্রয়োজনের সময় একবার সুবাসের ডাক পড়ল। সুবাসকে বড়কর্তা উপস্থিত পেল না। তিনি জানতে পারলেন সে এখন ঘূর্ণী দুর্গতদের জন্য ত্রাণ বিতরণ করে বেড়াচ্ছে, দু’দিনের ছুটিতে আছে।

এবারও ডাক পড়ল। বাবার মৃত্যুর কারণে সে যখন ছুটিতে তখন হঠাৎ তার ডাক পড়ল। এ ডাকটাই ছিল শেষ ডাক। যখন দেখলেন সুবাস ১ সপ্তাহ অফিসে আসে না তখন উচ্চশিক্ষিত বিরক্ত বড়কর্তা তার দক্ষ মানব সম্পদ ব্যাবস্থাপককে বললেন, “ এ সব মালাউন দিয়ে অফিস চালালে ব্যাবসার লাল-বাত্তি জ্বলবে। যত বেতন হয়েছে তা দিয়ে একে যেদিন আসবে সেদিনই বিদায় করে দেবেন। অ্যাডভান্স থাকলে কেটে রাখবেন।“ বুকে হৃদপিন্ডধারী বিবেকসম্পন্ন মানুষটা জানতেও চাইলেন না বাবাটা কতদিন মরণের সাথে যুদ্ধ করেছে, বাবার শয্যা পাশে ছেলেটা কতদিন না ঘুমিয়ে কাটিয়েছে, বাবাটার অর্ধাঙ্গিনী যিনি কি-না ছেলেটার গর্ভধারিনী তিনি কতদিন না কথা বলে কাটিয়েছেন।

২ সপ্তাহ পর মন্ত্রপাঠ শেষে বাবাকে স্বর্গবাসী করে সুবাস ফিরে আসবে কর্মস্থলে, মিশে যাবে পৃথিবীর কোলাহলে। তখন তার বসার ঘরে বাবার ফোনের অপেক্ষা থাকবে না, শোবার ঘরে মায়াবতী স্ত্রীটার অপেক্ষা থাকবে; কর্মস্থলে চাকুরিটার অপেক্ষা থাকবে না, জীবনটাতে শেষ বেতনটুকুর অপেক্ষা থাকবে।

ধানমন্ডি, ঢাকা, ২৬-সেপ্টেম্বর-২০১২

[অমর হতে হলে একবার মরে নিতে হয়।

মালালা এ পৃথিবী অথবা অন্য পৃথিবী যে কোন এক পৃথিবীর জন্য অপেক্ষমান। আমরা জানি মালালারা যেখনেই যাক না কেন অমর হয়ে যায়।

এ লেখাটি কিশোরী ব্লগার মালালার মনের মসজিদে উৎসর্গ করলাম।
মোহাম্মদপুর, ঢাকা,১৪-অক্টোবর-২০১২]