ক্যাটেগরিঃ নাগরিক আলাপ

আমরা কেউ আকাশ, কেউ সমুদ্র,কেউ ঝর্ণা আবার কেউ রূপালী চাঁদ। জুলজুব গোপনে গোপনে সমুদ্র, নীল আড়ালে আবডালে আকাশ আর মাধবীলতা আনমনে ঝর্ণা, আবার কোথাও কেউ একজন শেষ পর্যন্ত একজনেরই পূজারী।

একটি লেখায় একটি মন্তব্য করেছিলাম। প্রতি-মন্তব্যটি পড়ে বুঝেছি শ্রদ্ধেয়া সহব্লগারের হৃদয়ে অনেক ভালোবাসা এবং এই ভালোবাসার কিছু অংশ আমাদের রাষ্ট্রনায়িকা অথাৎ দেশের প্রধানতম ব্যক্তিটির জন্য বরাদ্ধকৃত। তিনি ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রধান দাবীদার হিসেবে মাননীয়া শেখ হাসিনাকে উল্লেখ করেছেন। তার এই উল্লেখযোগ্য কথাটিকে একটি প্রশ্নসহ মেনে নেয়া উচিত। প্রশ্নটি হলোঃ পুঁজিবাজার, সোনালী ব্যাংক, যুবক, ডেসটিনি, সবাই মিলে (৮৫+৩.৫+……) হাজার কোটি টাকা দেশ থেকে পাচার করেছে, জনগণের পকেটগুলো এভাবে শূন্য করার কৃতিত্বটা কার গলায় মালা পরাবে?

লেখিকা বলেছেনঃ “সাফল্য মানেই সুফল।“
আমি একমত হয়ে বলিঃ সবুজ বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন হৃদয়বান ছেলে যখন ১০১ টা পবিত্র মেয়ের ১০১টা মন থেকে ভালোবাসার নীল অপরাজিতাগুলো ছিন্ন করে ঘোষণা দেয় আমি পৌরুষে দ্বীপ্ত শ্রেষ্ঠ প্রেমিক, তখন পৃথিবীর মানুষগুলো তাকে প্রেমের সর্বশেষ দেবতা বলে স্বীকৃতি দেয় ( কারণ সাফল্য মানে সুফল এবং এক্ষেত্রে সেই সুফলটা ফলে পবিত্র মেয়েগুলোর সবচেয়ে পবিত্র অংশে (অর্থাৎ তার গর্ভে))।

লেখিকা বলেছেনঃ “মধ্যরাত্রির টক-শোতে চ্যানেল জুড়েই যাহারা গলাবাজি-গালিবাজি চালান, তা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী রসিকতা করেই গলাকাটা যদিও বলেছেন, তবুও কিন্তু টক-শো বন্ধের কথাটি বলেন নি। অবাধে টক-শো চলছে ডিজিটালি দেখছে দুনিয়ার এ প্রান্ত হতে ও প্রান্তবাসী সকলেই ওয়ার্ল্ড ওয়াইড। এ যদি ডিজিটাল স্বাধীনতা ভোগের অবাধ অধিকার না হয়, অধীনতা তবে কাহারে কয় ? প্রশ্নটি ওঠেনা কি ? “

আমি বলিঃ সৃষ্টিকর্তার অশেষ কৃপা। আমাদের সুখী রাখার উনার অনেক চেষ্টা। আমাদের সুখে রাখার জন্য তিনি ইগো-ডিফেন্স মেকানিজমকে বহাল রেখেছেন। কবিতা লিখতে না পারলে চেক-বই লিখি, গুণের অহংকারে সুখী হতে না পারলে রূপের অহংকারে সুখী হই। সুখ কোন না কোন উপায়ে আমরা খুঁজে পেয়ে যাই। নিজে বড় না হতে পারলে অন্যকে ছোট করে সুখী হই; নিজে বড় হলে ছোটগুলোকে টেনে তুলে নিয়ে সুখী হই। আমরা ছোট বড় সবাই সুখী হই। একটা দেশের অগ্রগতিতে মিডিয়ার অবদান অস্বীকার করার কোন উপায় নাই। একে স্বাভাবিকভাবে চলতে দেয়া রাষ্ট্রের দায়িত্বের মধ্যেও পড়ে না,কর্তব্যের মধ্যেও পড়ে না, যেমনটা কর্তব্যের মধ্যে পড়ে না বাতাস দক্ষিণে যাবে না উত্তরে যাবে সে সিদ্ধান্ত নেয়া। বাতাস বয়ে চলা স্বাভাবিক তবে একে বাধা দেয়া দোষের। এ দোষটা না করাটাকে গুণ বিবেচনা করে প্রশংসা করা উচিত, কেননা প্রশংসা সুখ দেয়।

‘তবুও কিন্তু টক-শো বন্ধের কথাটি বলেনি’ অর্থাৎ তিনি (গুণের কিছু না করুক অন্তত) দোষের কিছু করেনি নি। সুতরাং তিনি প্রশংসনীয়।

লেখিকা বলেছেনঃ “ উন্নতি সাধারন মানুষ নিশ্চয় করতে পারে যদি না রাষ্ট্র তাদের বাধা না দিয়ে অবাধ অধিকারটি দেয়। এ সত্য অস্বীকার করার মানেটা আমার কাছে দুর্বোধ্য। উপরন্তু রাষ্ট্রের নীতিগত সিদ্ধান্ত না থাকলে একটি দেশ কি করে ডিজিটালি এগিয়ে যাবার আকাশ ছুঁতে সক্ষম হয়”।

আমার কোন এক সময়ের মন্তব্যঃ আপনি (প্রবাসে) চলে যাওয়ায় দেশে একটি শূন্য পদে অন্তত একজন প্রার্থীর সংখ্যা কমে গেছে, তাতে আমরা যারা দেশে আছি তাদের সুযোগ সামান্য বেড়ে গেছে। তাছাড়া আপনারা যে রেমিটেন্স পাঠান তাকে পুঁজি করে আমরা পথ চলি নির্বিগ্নে। বড় বড় প্রতিষ্ঠান ও অঙ্গসংস্থাগুলো দেশটাকে ডুবিয়ে ফেলছে, তার পড়েও আমরা এগিয়ে যাচ্ছি কেন? দেশের অভিভাবকরা দায়িত্ব পালন না করে ক্ষমতার অপব্যবহার করছে তারপর আমরা সোজা দাঁড়িয়ে আছি কেন? এখানে জনগনের অভিবাবকদের কোন যাদু নাই। আমরা যারা গার্মেন্টস কর্মী,প্রবাসী, ব্যবসায়ী, কৃষক কিংবা খেটে খাওয়া জনগন তারাই দেশটার চাকা সচল রাখছি। আমরা দু’টা কাজ করি নিজেদের কষ্ট কমাই আর অভিভাবকদের ছোবল থেকে নিজেদের আড়াল করার আপ্রান চেষ্টা করি।কিন্তু সফল হই না কখনো; একবার ৮৫ হাজার কোটি হারাই, হারানোর ব্যথা ভুলতে না ভুলতেই আবার ৩.৫ হাজার কোটি হারাই।

লেখিকা বলেছেনঃ”এই যে আমিও মধ্যরাত্রিতে ডিজিটালি লিখছি সে আমার অবাধ স্বাধীনতার অবাধ অধিকার বলেই মানছি, কৃতজ্ঞতাও অনুভব করছি। এই অনুভবটি ছাড়া আমার আমি নিজের কাছে ছোটই হই নিশ্চয়। সে আমার কিছুতে করা সম্ভব নয়। যাহারা করে তাহারা ক্যামন মানুষ ? তাহারা কি জাত ? “

আমার কথাঃ যে ছোট তাকে প্রতিকূল সমালোচনা করে, নিন্দা করে বা দমন করে আর বড় হবার সুযোগ দেই না( দিয়েতো আমাদের কারু কোন লাভ নেই)। কিন্তু বড়গুলোর জন্য প্রশস্ত রাস্তা খুলে রাখি। আনুকূল্য পাবার জন্য তাদের স্তুতি গাই, প্রশংসা করি। তাদের অপকর্মগুলো গোপন করি অথবা দৃষ্টি প্রতি-বন্ধক চশমা দিয়ে দেখি। ফলে তারা যত বড় কাঁটাওয়ালা বাবলা গাছই হোক না কেন,তাদের দায়িত্বহীনতাগুলো গোপন থেকে যায়। ফলে তাদের মধ্যে যারা যত ক্ষুদ্র তাদের তত বড় দেখায়।

ডিজিটাল বাংলাদেশের সংজ্ঞা প্রয়োজন
কল্পণা জ্ঞানের চেয়ে সেরা। ডিজিটাল আমার কল্পণায় আছে, তবে জ্ঞানে নাই,#। ডিজিটাল বাংলাদেশের সংজ্ঞা এখনও খুঁজে পাইনি। আমি আর সংজ্ঞার দিকে যাব না, ভালোবাসার মত একে শুধু উপভোগ করে যাবে, ব্যাখ্যা করতে যাব না, প্রচারে মেতে উঠব না।

এনালগের সেই দিনগুলো
আগেও বলেছি ডিজিটাল করে ফেলার প্রতি আমার মাত্রাতিরিক্ত কোন প্রীতি নাই। ক্ষেত্র, সময় ও আয়োজন ভিত্তিক সার্বিক ও প্রয়োজন মাফিক ব্যবস্থা প্রয়োজন। সব কিছু ডিজিটাল করে ফেলার মাঝে গৌরব, সমাধান বা কৃতিত্বের কিছু দেখি না। আজকাল ডিজিটাল রবীন্দ্র সংগীত শুনে অতীতের সব ইতিহাস ভুলে যাই। অথচ এমনও যুগ ছিল শুধুমাত্র একটা রবীন্দ্র সংগীত শুনেই ১ দিন অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকা যেত। সেই দিনগুলোতে সব প্রেয়সীর ঠোট ছিল লাল গোলাপের পাপড়ি দিয়ে গড়া। এখন আর কোন প্রেয়সীর ঠোটে গোলাপের পাপড়ি খুঁজে পাই না। সবার ঠোটে শুধু লিপস্টিকের ছলনাময়ী ঘ্রাণ।

ডিজিটাল বিভেদ
ডিজিটালকে দু’টি প্রধান দল দু’টি ভিন্ন চোখে দেখে। কারণ তারা একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। (বয়সটা খারাপ) সামান্য রোম্যান্টিক্যালি বলি, তারা একই চাঁদের দু’টি ভিন্ন দিক। ক্ষমতায় থাকলে উন্নয়নের জোয়ারে ভাসা পূর্ণিমা; ক্ষমতায় না থাকলে প্রতিবাদী অন্ধকারাচ্ছন্ন অমাবস্যা। আমার পর্যবেক্ষণ বলে যারা জনপ্রিয় এবং মহান তারা প্রেমিক অথবা প্রেমিকা। এই শহরে আমি প্রকাশ্যে (কিংবা নিভৃতে) প্রেমিক প্রেমিকা দেখি কিন্তু কোন দলেরই রাজনীতির মঞ্চে কোন প্রেমিক প্রেমিকা দেখি না। যাদের দেখি তারা দেব দেবী অথচ নিজেরাই পূজা করে অন্য কিছুর। ক্ষমতা তাদের কাছে সবচেয়ে বড় পূজার পাত্র।কেননা ক্ষমতায় আনুগত্য আসে, সম্পদ আসে, সুখ আসে, সব আসে।

ধানমন্ডি, ঢাকা, ৮-নভেম্বর-২০১২
____________________________________________________________________________
১। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ায় অতীত ও বর্তমানে রাষ্ট্রের অভিভাবকদের অসহযোগিতা ছিল এবং আছে। এ দেশ যতটুকু এগিয়েছে তার সবটুকু সাফল্যের দাবীদার শুধুমাত্র জনগণ। (রাষ্ট্রের অভিভাবকরা যোগ্যতার চেয়ে বেশি ক্ষমতাবান, তাই তারা ক্ষমতার অপব্যব্যহারকারী)। জনগণের হৃদয়ে সোনার বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন (স্বপ্ন বাস্তবায়নে প্রযুক্তি হিসেবে ডিজিটাল প্রযুক্তি থাকতে পারে, তবে এনালগকে সাথে নিয়ে)। একটা দেশ কখনই ডিজিটাল হতে পারে না। এখানে আবেগ থাকবে, ভালোবাসা থাকবে, ভাঙা থাকবে, গড়া থাকবে। শুধুমাত্র হ্যাঁ বা না থাকবে না। হৃদয়কে মুখের ভাষায় প্রকাশ পেতে দিতে হবে। তবে বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়া অবশ্যই পরিশ্রমী জনগণের জন্য অনেক সুখের।

২। রাষ্ট্রনায়ক বলতে স্বাছন্দ বোধ করি না। নারীকে কথায় আর লেখায় পুরুষের মর্যাদা দিয়ে বাস্তবে অবরুদ্ধ রাখতে আমার কাছে নানন্দনিক মনে হয় না।

৩। যদিও দাবীটা তেমন কি-না তা আমার কাছে স্পষ্ট না। ডিজিটাল হোক, অসুবিধা নাই, কিন্তু তা যেন নাম সর্বস্ব না হয়। (জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানী এদেশগুলো সম্ভবত আমাদের চেয়েও বেশি ডিজিটাল, কিন্তু তাদের নামের পাশে এই আধুনিক বিশেষণটা যুক্ত হয় না কেন বুঝি না।)

# Imagination is more important than knowledge. Knowledge is limited. Imagination encircles the world.-Albert Einstein