ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

 

কন্যাকুমারীর পথে (১ম পর্বের লিংক)

http://blog.bdnews24.com/jamail/211883

****

পরদিন সকাল সাতটায় ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে বসে আছি নাস্তার অর্ডার দেব। অম্ভি আধাভানকে নিয়ে এসে বসে আছে। আধাভানের চোখে এখনও ঘুম।

অম্ভি :: জেবি তুমি খাবারের অর্ডার করো না, আম্মা (তেলেগুতে মা কে আম্মা বলে) অলরেডি ব্রেকফাস্ট আর লাঞ্চের অর্ডার করে দিয়েছে।

আমি :: আরে এটা কেন করতে গেলে, আমি দিব্বি খেয়েনিতাম। (আমি অবশ্য পরিতোষ বাবুর কথা ভাবছি, এখানে আবার খাবারের দাম দিতে হবে নাতো!!!)

অম্ভি :: আরে কি বলো? তুমি আমাদের গেস্ট না!! আচ্ছা তুমি ভেজ না নন-ভেজ।

আমি :: আমি ভেজও না নন-ভেজও না, আমি সর্বভুক!!!

এটা শুনে সবাই হাসিতে গড়িয়ে পড়ল।

Mullu-Murukku

Koil Puliyodharai_8

নাস্তা আসল, দেখতে রুটির মত হলেও এর নাম ফুলকা সাথে ভাজি আর ডিম পোচ। নাস্তা শেষ করে কফি খেতে খেতে জমল আড্ডা। এদিকে মাঝে মাঝেই অম্ভির ফোন আসছে আর সে তেলেগু ভাষায় কি সব বলে ফোন রেখে দিচ্ছে। ভাষা না বুঝলেও এটা বুঝতে পারছি সে কাউকে তার বর্তমান অবস্থার আপডেট দিয়ে দ্রুত ফোন রেখে দিচ্ছে। আমাদের দেশের মেয়েরা যেমন বলে “এই আম্মু আসছে ফোন রাখি…” এ ধরনের।

আন্টি অবশ্য একটা গল্পের বই নিয়ে পড়তে বসে গেছে আর আধাভানতো নাস্তার পর আবার ঘুমে। আমি অম্ভিকে সরাসরি জিজ্ঞেস করলাম, ছেলেটি কে?

অম্ভি :: (স্মার্টলি উত্তর দিল) তুমি কিভাবে বুঝলে ফোনের ওদিকে ছেলে ছিলো না মেয়ে?

আমি :: আচ্ছা তাই! হাইদ্রাবাদের কোন মেয়ে আর একটা মেয়ের সাথে ফোনে কথা বলার সময় যে লাল হয়ে যায় আগে জানতাম না!!

অম্ভি :: (এখন আগের চেয়ে আরো বেশী লাল হয়ে বলল) ওর নাম কেতন। আমরা একসাথেই পড়ি। তুমি আবার আম্মার সামনে এসব নিয়ে ডিসকাস করো না।

আচ্ছা তোমার কথা বলো। তুমি নিশ্চয়ই একা নও?

আমি :: না আমি একা নয়, ওর নাম পাপিয়া, আমার জুনিয়র, একই ডিপার্টমেন্টে।

অম্ভিার মুখের লাল আভা কমে এল আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম:

আমি :: আচ্ছা, তেলেগু “আন্দারু নিদরাপোয়ারু” মানে কি?

অম্ভি :: (একটু আড়ষ্ঠ হয়ে গেছে, চোখে মুখে এখন সন্দেহ) আন্দারু নিদরাপোয়ারু মানে হচ্ছে, সবাই ঘুমাচ্ছে। হঠাৎ এটা জানতে চাইছ কেন?

আমি :: না তেলেগু শেখার চেষ্টা করছি।

অম্ভি :: কি? কেউ কখনও আন্দারু নিদরাপোয়ারু দিয়ে তেলেগু শেখা শুরু করে? কি ব্যাপার জেবি? কোন কারনতো অবশ্যই আছে।

আমি :: আচ্ছা আর একটা লাইন “নেনু চালা তাপ্পিনা সিচিনা” মানে কি?

কথা শেষ না হতেই হাতের কাছের পেপারটা আমার দিকে ছুড়ে, চোখ কটমট করে তাকিয়ে আছে। আর আমি মিটিমিটি হাসছি দেখে অম্ভি আমাকে জিজ্ঞেস করল:

অম্ভি :: আমি যখন রাতে ফোনে কথা বলছিলাম, তুমি সব শুনেছ তাই না?

আমি :: হ্যা, পুরোটাই। কিন্তু তুমি এতো লজ্জা পাচ্ছ কেন, আমি শুধু শুনেছি কিন্তু কিছুই তো বুঝিনি। হা হা হা।

অম্ভি :: উউফ! বাচালে!! কিন্তু তুমি এগুলো মনে রেখেছ কিভাবে? “নেনু চালা তাপ্পিনা সিচিনা” মানে “আমি তোমাকে অনেক মিস করছি”।

গল্প করতে করতে দুপুর হয়ে গেছে, লাঞ্চ টাইম, কিন্তু আমাদের লাঞ্চ আসার আগেই গতরাতে ভারতী এয়ারটেলের যার সাথে পরিচিত হয়েছিলাম সেই প্রসাদ আর বিজেই এসে বলল জেবি তুমি আমাদের সাথে লাঞ্চ করবে। বাহ! গতকাল পরিতোষ বাবু একটা এসএমএস করে তিন টাকা চেয়ে বসেছিল আর এরা দু’পক্ষই লাঞ্চের দাওয়াত দিয়ে বসছে। অম্ভির মা তেলেগুতে প্রসাদকে খুবই অমায়িকভাবে কি জানি বললেন। তাইশুনে প্রসাদ আমাকে বলল: ওকে জেবি, লাঞ্চ করে নাও, বিকেলে আড্ডা হবে। এদের আন্তরিকতায় কিন্তু আমি সত্যিই মুগ্ধ।

লাঞ্চ এলে অম্ভি এক এক খাবার গুলোর নাম বলছিলো: পুলিওদারাই, কোজহি, কোলা উন্দুরী, উলুরাই, সাম্বার, মুরুক্কু, থেঙ্কাই চাটনি আর পাসি পারাপ্পু। নাম শুনেই পেট ভরে গেছে। আহারে দু’টো সাদা ভাত, বেগুন ভাজা আর মসুরের ডাল থাকলে কতই না ভালো হত…….

****

একে একে সবগুলি তামিল খাবার চেখে দেখলাম। এর কোনোটি খুবই মজার, কোনোটি জঘন্য। অম্ভি আর আধাভানের খাওয়া দেখে যে কারো লোভ লাগবে। আন্টি কোথায় যেন গেছেন। প্রসাদ আর বিজেইর দাওয়াত নিলেই মনে হয় ভালো করতাম। যাহোক যেগুলো ভালো লাগছে সেগুলোই খাচ্ছি।

আন্টি ফিরে এলেন, হাতে একটি ব্যাগ। আন্টি আসতেই অম্ভি আমার সামনে থেকে সব খাবার সরিয়ে রাখল।

অম্ভি :: জেবি, তোমাকে এসব আর কষ্ট করে খেতে হবে না। আম্মা তোমার জন্য প্যান্ট্রী কার থেকে খাবার নিয়ে এসছেন। কলকাতাতে আম্মার অনেক বাঙালী বন্ধু আছে। তারা তামিল খাবার খেতে পারে না। সকালেই আম্মা তোমার জন্য আলাদা করে স্পেশাল অর্ডার করেছিল। সেটাই নিয়ে এসছে, নাও দেখ এটা খেতে পারো কিনা?

সত্যিই মা এরকমই হয়! গতকালের পরিচয়, আর আজ সকালে ঘুম থেকে ওঠার আগে খাবার অর্ডারের রহস্য এতক্ষণে বুঝতে পেরেছি। লাঞ্চবক্স খুলেই সুঘ্রাণে জিভে পানি এসে গেল, হাইদ্রাবাদী মাসালা চিকেন বিরিয়ানী! খাবার শেষ করে আন্টিকে ধন্যবাদ জানাবো কি উনি আরো উল্টো বললেন দেখ এর চেয়ে ভালো কিছু আজ প্যান্ট্রী কারে পাওয়া যায়নি। তুমি ভুবনেশ্বরে বেড়াতে এসো তোমাকে রান্না করে খাওয়াবো।

আন্টি :: জেবি তুমি কি জানো কোন জায়গার বিরিয়ানী সবচেয়ে জনপ্রিয়?

আমি :: (আমাদের ঢাকাইয়া বিরিয়ানী নিঃসন্দেহে সেরা কিন্তু হাইদাবাদী বিরিয়ানীও ভালো। আমি ইতোস্তত করছি….. হাইদ্রাবাদী বিরিয়ানী খেতে খেতে ঢাকাইয়া বিরিয়ানীর সুনাম করব, ব্যাপারটা বেশী স্বার্থপরতা হয়ে যাবে না! আর এরা ঢাকার বিরিয়িানীর স্বাদ পাবে কোথা থেকে। কোনটা বলব ঢাকাইয়া না হাইদ্রাবাদী?)

অবশ্য আন্টিই আগে মুখ খুললেন………… :: আমাদের হাইদ্রবাদী বিরিয়ানী দ্বিতীয়!

আমি :: ওহ! তারমানে ভারতে এর চেয়েও ভালো বিরিয়ানী পাওয়া যায়?

আন্টি :: তোমাদের ঢাকার বিরিয়ানী এক নম্বর!! ঐ দেখ কাল রাতে সময় পায়নি  আর আজ সকালে বিরিয়ানী নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম…. তোমাকে তো বলাই হয়নি আমি দুইবার ঢাকা ঘুরে এসছি।

আমি :: একটু বিষ্মিত ও লজ্জিত হয়ে আগে বলেননি যে?

আন্টি :: হুমম আগে গল্প করতে গেলে অম্ভি তোমাকে পুলিওদারাই, কোলা উন্দুরী, সাম্বার আর পাসি পারাপ্পু দিয়ে লাঞ্চ করাতো।

(এই শুনে সবাই হাসিতে গড়িয়ে পড়ল)

আন্টি :: তোমাদের তিনটি জিনিস আমি কোনোদিন ভুলব না। ইলিশ, বিরিয়ানী আর সবচেয়ে গুরত্বপূর্ণ হল তোমাদের আতিথেয়তা।

এবার আমার লাল হবার পালা!! নিজ দেশের প্রশংসা শুনে অবশ্য ভালোই লাগছে।

আন্টি :: দু’বারে ঢাকার কাছাকাছি দুই জায়গায় ফিল্ড ট্রিপ ছিল। প্রথমবার সোনারগাঁও।

আমি :: আপনি সোনারগাও গেছেন?

আন্টি :: হ্যাঁ। খুবই সুন্দর জায়গা। ভাবা যায় চারশ বছর আগে কি জমজমাট ছিল ঐ জায়গাটি। আস্ত একটা শহর। কিন্তু আমার অবাক লাগল তোমাদের আর্কিওলোজিক্যাল ডিপার্টমেন্ট কেমন একটা দায় সারা কাজ সেরেছে। তেমন এটা দেখভাল হয়না অবশ্য আমরা তেমন কাউকে পায়নি সেখানে।

আমাদের দেশে দেখ মুঘল ও রাজপুতদের স্থাপনাগুলো আমরা কেমন যত্ন নিই। তোমার কোনো আইডিয়া আছে আমাদের পর্যটন শিল্পের এই খাত থেকে ইয়ারলি কত রেভিন্যু আসে। তাজমহলের কথা নাই বাদই দিলাম শুধু আগ্রা আর জয়পুরে ফতেপুর, সিক্রি, আগ্রাফোর্ট, অ্যাম্বারফোর্ট, প্যালেস কত কি আছে। এই স্পট গুলোর সাথে কত প্রকারের বিজনেস জড়িত…… যোগাযোগ, যাতায়াত, আবাসন, খাদ্য, স্যুভিনির সপ কত কি।

40378767

আর সারা ভারত জুড়ে এরকম অসংখ্য স্পট ও স্থাপনা আছে। আর তোমাদের আছে চারশ বছর পুরোনো আস্ত একটা শহর, চিন্তা করতে পারো। এটাকে ঠিকমত নার্সিং করলে সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক দুভাবেই বাংলাদেশ লাভবান হবে। আরো আছে কক্সবাজার সৈকত। ইচ্ছে আছে পরেরবার বাংলাদেশে গেলে কক্সবাজার ঘুরে আসব। দেখ আমি একটু একটু বাংলা বুঝি। মাঝে মাঝে বাংলা গান শোনা হয়। আব্বাস উদ্দিনের গান, লালনের গানও আমি শুনেছি….. অসাধারণ!!

আমি মন্ত্র মুগ্ধের মত আন্টির মুখের দিকে তাকিয়ে আছি। একজন ভারতীয় কিভাবে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার কথা বলছে। আমাদের অবহেলাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছেন।

হঠাৎ অম্ভি আমার কাধ ধরে ঝাকি দিল…

অম্ভি :: এই জেবি কি ভাবছ?

আমি :: না। তেমন কিছু না…. (ততক্ষণে চোখ ভিজে গেছে) আন্টি ব্যাপারটা বুঝতে পেরে পরিবেশ স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলেন।

আন্টি :: শোন যখন দ্বিতীয়বার ঢাকায় যায় তখন গিয়েছিলাম টাঙ্গাইল। শাড়ি এনেছিলাম চারটে। তার একটা আমার বোন, একটা আমার ভাবি আর বাকি দুটো

অম্ভির দখলে। অম্ভি এমনিতে শাড়ি পরে না কিন্তু পরলে সেই টাঙ্গাইলের শাড়ি। হ্যা জেবি তোমাদের টাঙ্গাইলের শাড়িও কিন্তু সেরা। গল্প করতে করতে কখন যে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়েছে টেরই পায়নি।

বিকেলে প্রসাদ, বিজেই আর তার বন্ধুরা যোগ দেওয়াতে আড্ডাটা আরো জমল। আন্টি ব্যাগ থেকে কারাসেভু আর খেত্তাই বের করলেন। কারাসেভু আর খেত্তাই খেতে মচমচে এবং সুস্বাদু। ইভিনিং স্ন্যাক্স হিসেবে এগুলির জুড়ি নেই। দেখতে দেখতে ট্রেন থেকে নামার সময় হয়ে গেছে। সবারই মন খারাপ। মনে হচ্ছে আর কোনোদিন দেখা হবে না। সবাই কথা দিলাম যোগাযোগ রাখব। অম্ভিতো কথা বলাই বন্ধ করে দিয়েছে, তার নাকি প্রচন্ড কান্না পাচ্ছে। আমি সবাইকে বাংলাদেশে বেড়াতে যাবার দাওয়াত দিলাম।

DSC00585

ট্রেন দু’ঘন্টা লেটে ছাড়লেও সাড়ে ছাব্বিশ ঘন্টার জার্নিতে ড্রাইভার এক ঘন্টা পুশিয়ে নিয়েছে। অম্ভিরা এখানেই নেমে যাবে, প্রসাদরা অন্য ট্রেন ধরে ত্রিভুন্দাপুরাম যাবে আর আমাকে আগে জানতে হবে কোন ট্রেন এখান থেকে মাদুরাই যায়।

সবাই ট্রেন থেকে নামলাম। আমি আর প্রসাদ অম্ভিদের লাগেজ নিয়ে ট্যাক্সিস্ট্যান্ডে গেলাম। অম্ভির চোখ এখনও ছলছল করছে। ওদেরকে বিদায় দিয়ে প্রসাদও বিদায় নিলো টিকেট কাটার জন্য। আমি গেলাম ইনফর্মেশন ডেস্কে। শাড়ি পরিহিতা, খোপায় ফুল দেওয়া এক মহিলা সেখানে বসা। হিন্দীতে জিজ্ঞেস করলাম মাদুরাই যাবার ট্রেন সম্পর্কে। উনি আমার মুখের দিকে একবার তাকিয়ে আবার নিজের কাজে ব্যস্ত হল। আমি দ্বিতীয়বার জিজ্ঞেস করলাম, উত্তর নেই। তৃতীয়বার জিজ্ঞেস করাতে মহিলা মুখ খুললেন:

মহিলা :: ইংলিশ, স্যার?

আমি :: অফকোর্স! আই ওয়ান্ট টু গো টু মাদুরাই। হাও ক্যান আই গো দেয়ার?

মহিলা :: গো ইগমোর।

আমি তখনও জানিনা যে ইগমোর কি, এটা কি কোন ট্রেনের নাম? সেখান থেকে সরে গিয়ে এক রেলওয়ে পুলিশকে জিজ্ঞেস করলাম।

পুলিশ :: স্যার, নো ট্রেন ফর টুডে ফ্রম হিয়ার টু মাদুরাই। ইউ শুড গো ইগমোর স্টেশন বাই ট্যাক্সি।

বুঝলাম রবিবার রাতে চেন্নাই সেন্ট্রাল থেকে মাদুরাই কোন ট্রেন নেই। আমাকে এখান থেকে পাশের ইগমোর স্টেশনে যেতে হবে। স্টেশন থেকে বের হয়ে ট্যাক্সিতে করে ইগমোরে গেলাম। সেখানে আর এক হুলুস্থুল অবস্থা। ট্রেন দুরে থাক প্লাটফর্মেই ঢোকা যায় না, এত ভিড়।

একে ওকে জিজ্ঞেস করলাম, কাজ হল না, না জানে হিন্দী, না জানে ইংলিশ। এদিকে সময় গড়িয়ে যাচ্ছে। কি বিপদ! কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে কোর্ট টাই পরা একজন প্যাসেঞ্জারকে পাসপোর্ট দেখিয়ে বললাম আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি। অনুরোধ করলাম সাহায্য করার জন্য।

উনি যা বললেন তাতে মনটা আরো খারাপ হয়ে গেল।

প্যাসেঞ্জার :: এখন এখান থেকে সিট পাবার কোনো সম্ভাবনা নেই আর ট্রেনে এত ভিড় যে এই লাগেজ নিয়ে উঠতে পারলেও সারা রাস্তা দাড়িয়ে থাকতে হবে। আপনি এক কাজ করুন কুয়েম্বেদু চলে যান, ওখান থেকে বাসে করে মাদুরাই। কুয়েম্বেদু চেন্নাইয়ের সবচেয়ে বড় বাস টার্মিনাল। সেখান থেকে ভারতের প্রায় সব জায়গায় বাসে যাওয়া যায়।

আমি :: এতদুর রাস্তা বাসে!! (কিন্তু অন্য উপায় নেই)। কুয়েম্বেদু যাব কিভাবে?

তিনি একটি ট্যাক্সি ডেকে তামিল ভাষায় কি সব বলে আমাকে ট্যাক্সিতে উঠতে বললেন। আমি তাকে ধন্যবাদ দিয়ে ট্যাক্সিতে উঠলাম। ট্যাক্সি যে রাস্তায় যাচ্ছে সেটি চেনা চেনা লাগেছে, হ্যা এই রাস্তা দিয়েই কিছুক্ষণ আগে আমি ইগমোরে গেছি।

একটি ব্যস্ত সড়কের পাশে অনেকগুলি ছোট ছোট দোকানের সামনে ট্যাক্সি থামল। এখানে কোনো টার্মিনাল দেখতে পাচ্ছি না কিন্তু দোকান গুলি যে বাসের কাউন্টার সেটা বুঝতে পারছি। কিন্তু দুর পাল্লার বাস কই?

ট্যাক্সি থেকে নামার পরই আমাকে নিয়ে টানাটানি শুরু হল, গাবতলীতে যেমনটা হয়। ইহা গোফওয়ালা সাদা লুঙ্গি জামা পরিহিত ষন্ডামার্কা এক লোক সবাইকে সরিয়ে আমার লাগেজটি কোল বালিশের মত করে করে তুলে আমার দিকে তোষামদি মার্কা এক ভয়ঙ্কর হাসি দিল। আমি কথা না বলে অন্যদের হাত থেকে বাচতে তার পিছু নিলাম।

তার কাউন্টারে ঢোকা মাত্রই আমার সামনে আগরবাতি ঘুরিয়ে কি সব বলল বুঝলাম না। তাকে জিজ্ঞেস করলাম হিন্দী বা ইংলিশ জানে কিনা।

কাউন্টারম্যান :: হিন্দী অর ইংলিশ তেরিয়াতু।

তেরিয়াতু তামিল শব্দ এর অর্থ “জানিনা”। মেজাজটা প্রচন্ড খারাপ হল। তাকে এবার জিজ্ঞেস করলাম বাংলা, ফার্সি, উর্দু, স্প্যানিশ, ইটালিয়ান, আরবি, ফ্রেন্স, চাইনিজ, জাপানী এগুলোর কোনোটা জানো।

সে কোনো কথা না বলে টিকেট বের করে কোথায় যাব ঈশারা করল।

আমি :: মাদুরাই, এসি বাস।

কাউন্টারম্যান :: (হিসেব করে ভাঙা ভাঙা ইংলিশে বলল) ওয়ান থাওজেন্ড থার্টি রুপিজ।

আমি :: এসি বাস?

সে গুড বাস বলে আমাকে একটি মানি রিসিপ্ট দিল। সেটি হাতে নিয়ে তো আকাশ থেকে পড়ার অবস্থা। সেখানে ডেস্টিনেশনের ঘরে ইংলিশে লিখেছে মাথুরাই, নাগপুর। আর আমি যাব মাদুরাই।

হাই হাই!!!! ও আমাকে টিকেট দিয়েছে নাগপুরের কাছে মাথুরাই নামের এক জায়গার যা এখান থেকে বারো’শ কিরোমিটার উত্তরে আর আমি যাব মাদুরাই যা এখান থেকে সাড়ে চারশ কিলোমিটার দক্ষিণে। একবারে বিপরীত দিকে।

ভুলটা আমারই, এর কাউন্টারে আসা ঠিক হয়নি। হঠাৎ দেয়ালে টাঙানো ম্যাপটায় চোখ পড়ল। সেটি নামিয়ে এনে তাকে দেখালাম আমি কোথায় যেতে চাই। সে দু’হাতে কান ধরে দাত দিয়ে জিভ কাটল। যেন কিছুই হয়নি এরকম ভঙ্গিতে মানি রিসিপ্টটি ছিড়ে ফেলে নতুন মানি রিসিপ্ট দিল। সেখানে মাদুরাই লেখা থাকলেও ভাড়া লেখা ফোর হান্ডেড এইট্টি রুপিজ।

সন্দেহ হল প্রায় সাড়ে চারশ কিলোমিটার এসি বাসে এত কম ভাড়া হওয়ার কথা নয়। তাকে আবার বললাম এসি বাস। সে হাত ঈশারা করে বলল গুড গুড। কিন্তু এটি তো মানি রিসিপ্ট।

আমি :: টিকেট?

কাউন্টারম্যান :: টিকেট? কুয়েম্বেদু। ঘড়ি দেখিয়ে বলল ইলেভেন, কাম হিয়ার।

যা ভেবেছিলাম তাই। এটি কুয়েম্বেদু নয়। এগুলো সাব-কাউন্টার। রাত এগারটায় এখান থেকে পিক আপ বাসে করে কুয়েম্বেদু যেতে হবে। এখন বাজে সাড়ে সাতটা, সাতে তিন ঘন্টা কি করব? কাউন্টারম্যান আমার হাত থেকে লাগেজটি তার চেয়ারের পাশে রেখে দিয়ে ঈশারা করল, বাইরে ঘোরাঘুরি কর, খাওয়া দাওয়া কর। আমি লাগেজের দিকে ঈশারা করতেই বলল নো প্রোবলেম, গো।

যা আছে কপালে, লাগেজ সেখানে রেখে দোকান থেকে বের হতেই আর একবার ধাক্কা খেলাম। রাস্তারে ওপারে বড় করে লেখা চেন্নাই সেন্ট্রাল টার্মিনাস। তারমানে আমি এখান থেকে প্রথমে ইগমোর গেছি, সেখান থেকে আবার পাজি ট্যাক্সিওয়ালা আমাকে কুয়েম্বেদুর পরিবর্তে চেন্নাই সেন্ট্রাল স্টেশনের সামনে নামিয়ে দিয়েছে। ব্যাপারটা এরকম যে, আমাদের দেশে কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে প্রথমে কলাবাগান গেছি, সেখান থেকে গাবতলীর পরিবর্তে আবার ফকিরেরপুল বাস কাউন্টারে নামিয়ে দিয়েছে।

আমার অবশ্য এখন আর বেশী খারাপ লাগছে না। অন্নত এই অঞ্চলটা একটু হলেও পরিচিত হয়ে গেছে। প্রসাদকে ফোন দিলাম দেখি ওরা টিকেট পেল কিনা। প্রসাদ ফোন ধরেই:

প্রসাদ :: হ্যা, জেবি ট্রেন পেয়েছ?

আমি :: না, সে লম্বা কাহিনী, বাসে যাব। তোমাদের কি অবস্থা?

প্রসাদ :: আমাদের ট্রেন রাত সাড়ে বারোটায়। প্লাটফর্মে বসে আড্ডা দিচ্ছি।

আমি :: গুড! তাড়াতাড়ি স্টেশনের বাইরে আসো আমি মেইন গেটেই আছি।

মিনিট পাঁচেকের মধ্যে প্রসাদসহ তিন জন এল। বাকিরা লাগেজের সাথে ভিতরে আছে।

প্রসাদ :: কি ব্যাপার তুমি এখানে?

আমি পুরো ঘটনা খুলে বলাতে ওরা দুঃখ প্রকাশ করল। যা হবার হয়েছে, এখন কি করা যায়? পরে একটি ট্যাক্সি নিয়ে চেন্নাই ঘুরতে বের হলাম।

DSC00442

রাত দশটা পর্যন্ত ঘুরে রাতের খাবার জন্য একটি তামিল হোটেলে গেরাম। ভিতরে রসুনের উৎকট গন্ধ আর কেমন একটা মশলা মশলা পরিবেশ। টেবিলে বসার পর প্লেট আর কলাপাতা দিয়ে গেল। প্লেটের উপর কলাপাতা আর পাশে ওয়ান টাইম গ্লাস। মেনু আগেই বলে দিয়েছি সাদা ভাত, মুরগীর মাংশ, মটর পনির আর ডাল। খাবারের পরিবেশন দেখেতো মাথা খারাপের মত অবস্থা। দু’ভাজ করে লুঙ্গি পরা কালো মোটা এক লোক আমাদের টেবিলের পাশে দাড়ালো। হাতে ছোট ছোট চারটে বালতি একসাথে বাধা। একটিতে মাংশ, একটিতে মটর পনির, একটিতে ডাল আর একটিতে মাছ। বালতিতে করে তরকারী, চিন্তা করা যায়! কোনো রকমে খাওয়া শেষ করে বাস কাউন্টারে গেলাম।

এগারটার কিছু আগে পিকআপ বাস আসল। প্রসাদদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে কুয়েম্বেদুর দিকে চললাম। কুয়েম্বেদু পৌছে দেখি এলাহীকান্ড! বিশাল টার্মিনাল। এখানে ভারতের প্রায় সব জায়গায় উদ্দেশ্যে গাড়ী ছাড়ে। মানি রিসিপ্টে দেখলাম আমার বাসের নাম পারভিন ট্রাভেলস। একজনকে জিজ্ঞেস করতেই দেখিয়ে দিল, টার্মিনালের এক কোনায় সুদৃশ্য এটি পরিবহন অফিস। গ্লাস আর কাঠের অদ্ভুত কম্বিনেশন। পরিস্কার তকতকে, পুরো সিস্টেম কম্পিউটারাইজ্ড। গেটাপে বলছে ভিতরের সবাই মুসলিম। আমি কাচের দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকেই লম্বা একটা সালাম দিলাম।

সবাই একসাথে “ওয়া আলাইকুম আস সালাম”। পাসপোর্টটি টেবিলে রাখতেই একজন নিয়ে বলল: বাংলাদেশ! ওয়েলকাম স্যার!! মানি রিসিপ্ট দিলাম ওরা কম্পিউটার থেকে টিকেট বের করে দিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম গাড়ী কি ধরনের। ডাবল টায়ার এসি স্লিপার করোনা! বিশ্বাস হয়? বাসে স্লিপার। ভাড়া মাত্র চার’শ পঞ্চাশ রুপি, ত্রিশ রুপি যেখান থেকে টিকেট বুকিং দিয়েছিলাম তার কমিশন। তাদেরকে জিজ্ঞেস করলাম, এত কম টাকায় এত ভালো সার্ভিস কিভাবে সম্ভব! জানালো তামিল নাড়ু রাজ্য সরকারের নিয়মের বাইরে তারা যেতে পারে না।

একজন স্টাফ এসে আমার লাগেজ নিয়ে গেল। এই বাস মাদুরাই হয়ে ত্রিভুন্দাপুরামে যাবে। ভোর ছয়টার দিকে মাদুরাই পৌছাবে। আমার সিট নিচে এল-সেভেন। সিট না বলে বেড বলাই ভালো।

আহ রে! আমাদের দেশে যদি এরকম সার্ভিস থাকতো!!!!

(চলবে………….)