ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

জাতিগোষ্ঠীতে বৈচিত্রপূর্ণ দেশ মিয়ানমার। ঐ সরকারের তথ্য মতে, সেখানে ১৩৫টি জাতিগোষ্ঠী রয়েছে যারা আটটি প্রধান ভাগে বিভক্ত- বামার, কাচিন, কাইয়াহ, কাইন, চিন, মুন, রাখাইন, শান ও অন্যান্য (ওয়া, নাগা, লাহু, লিসু ও পালাউঙ)। এদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতিগোষ্ঠি যারা মিয়ানমারের জাতিসত্ত্বার মূলধারা বহন করে তারা ‘বামার’ হিসেবে পরিচিত। এ সংখ্যা মাত্র ৬৮ শতাংশ, জনসংখ্যার বাকী অংশ ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলের অভিবাসীদের নিয়ে গঠিত সংখ্যালঘু জাতি, যাদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি আছে। এ কারণে অভিবাসীদের প্রতি রক্ষণশীল বার্মিজদের সবসময়ই এক ধরণের নেতিবাচক, অসংবেদনশীল, সাম্প্রদায়িক ও পক্ষপাতিত্ত্বমূলক আচরণ প্রকাশ পেয়েছে। ফলে বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন সংখ্যালঘুরা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিচ্ছিন্নতাবাদীতা, স্বাধীনতা সংগ্রাম করেছে। মিয়ানমারের জাতিগত আন্দোলনের মধ্যে রয়েছে দীর্ঘ ষাট বছরের কারেন বিদ্রোহ, প্রায় পঁচাত্তর বছরের রোহিঙ্গা সঙ্কট, কাচিন প্রদেশের আঞ্চলিক সায়ত্ত্বশাসন প্রতিষ্ঠার আন্দোলন, কাইয়াহ প্রদেশের স্বাধীনতার জন্য কারেন্নি সামরিক বাহিনীর বিদ্রোহ এবং সমাজতন্ত্রী আন্দোলন। এ সকল আন্দোলনের মধ্যে রোহিঙ্গা সঙ্কটের সাথে বাকীদের একটি বিশেষ পার্থক্য রয়েছে, আর তা হলো ধর্মীয় বিশ্বাসের পাথর্ক্য- রোহিঙ্গারা মুসলমান। মিয়ানমারে অন্যান্য সকল জাতিগত আন্তঃদ্বন্দ্ব ধীরে ধীরে শান্তিপূর্ণ সমঝোতায় পৌঁছালেও রোহিঙ্গা সঙ্কটের কোন সমাধান আজ অব্দি সম্ভবপর হয়নি। তাই, স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন এসে যায়, রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধানে প্রধান অন্তরায় কী- বার্মিজ ও রোহিঙ্গা জাতিগত আন্তঃদ্বন্দ্ব, ধর্ম না যুগের পরে যুগ ধরে রোহিঙ্গাদেরই কর্মকাণ্ড?

ধর্মতাত্ত্বিকভাবে মিয়ানমারের অধিকাংশ জনগণ বৌদ্ধ ধর্মালম্বী যারা মোট জনসংখ্যার ৮৯ শতাংশ; অন্যান্য ধর্মালম্বীদের মধ্যে খ্রিস্টান ও মুসলমান উভয়ই রয়েছে ৪ শতাংশ হারে। মুসলিম জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে রাখাইন প্রদেশের ‘রোহিঙ্গা’ ও ‘কামেইন’ (বা কামান), চৈনিক অভিবাসী ‘পানথায়স’, ইন্দো-বার্মিজ সঙ্কর মুসলমান বা ‘জেরবাদি’ এবং ইয়াঙ্গুন ও মান্দালয়ের ভারতীয় বংশোদ্ভূত মুসলমানগণ। ফ্রাঞ্চিজ বুচানন-হ্যামিল্টনের (বার্মিজ রুল, ১৭৯৯) মতে এদের মধ্যে মুহাম্মদ (সঃ)- এর অনুসারীরা যারা অনেকদিন ধরে আরাকানে বাস করছে, তাদেরকে “রুইঙ্গা” বা “আরাকানের অধিবাসী” বলা হয়। অর্থাৎ, রোহিঙ্গারা আরাকানের (তথা মিয়ানমারের) অধিবাসী, বাংলার নয়। তবুও এ সকল সংখ্যালঘু মুসলমান আদিবাসীদের মধ্যে পানথায়স ও রোহিঙ্গাদেরকে মিয়ানমার সরকার তাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করতে চায় না। বিষ্ময়কর হলেও সত্য যে, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে অস্বীকৃত হলেও ২০১০ সালের জাতীয় নির্বাচনে তারা ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছিল।

বিশ্বের অন্যতম নিগৃহীত, সংখ্যালঘু ও সবচেয়ে কম প্রত্যাশিত জনপদ মিয়ানমারের নাগরিক অধিকার বঞ্চিত জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গা।  এরা কেবল নিজ দেশে পরবাসী নয়, পৃথিবীর সবচেয়ে প্রান্তিক ও নির্যাতিত জনগোষ্ঠী হিসেবেও পরিচিত। তবে, ঐতিহাসিকভাবে তারা মিয়ানমারের শুধু অবিচ্ছেদ্য অংশই নয়, দেশটির স্বাধীনতা সংগ্রামেও অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে। ১৯৪৭ সালে অং সানের সঙ্গে যে কজন স্বাধীনতাসংগ্রামী নিহত হন, তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন রোহিঙ্গা মুসলমান (ইউ রাজ্জাক) যিনি অং সানের শিক্ষা ও জাতীয় পরিকল্পনা মন্ত্রী ছিলেন।  ১৯৮৮ সালে অং সান সুচিকে রাজনীতিতে আনার ক্ষেত্রেও রোহিঙ্গা মুসলিম লেখক ও রাজনীতিক ‘মং থু কা’র (বা নূর মোহাম্মদ) ভূমিকা ছিল। তিনি পরে এনএলডির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যও হন। তারপরেও আজ রোহিঙ্গারা সব ধরণের নাগরিক সুবিধাবঞ্চিত- তাদের ভ্রমণ- চলাচল, শিক্ষা, কাজের অধিকার, বিবাহ, সন্তানের জন্মদান নিয়ন্ত্রিত; তারা জবরদস্তিমূলক শ্রম, কর আদায়ের শিকার; এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রের আদিবাসী হয়েও তারা রাষ্ট্র পরিচয়হীন মানবাধিকার বর্জিত মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য। অথচ, ইতিহাস প্রমাণ করে যে, তারা মিয়ানমারের অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর মতো প্রাচীনকাল থেকে মিয়ানমারে বসবাস করছে, আর পাঁচ-দশটা গোষ্ঠীর মতো তারাও এ দেশের অন্যতম আদিবাসী।

খ্রীস্টিয় সপ্তম শতকে ইরাবতি নদীর ব-দ্বীপ অঞ্চলে ও পরবর্তীকালে অষ্টম বা নবম শতকে রাখাইন অঞ্চলে আরব মুসলিমদের আগমণের মধ্য দিয়ে মিয়ানমারে ইসলামের আগমণ ঘটে। সমসাময়িককালে  তুর্কি, আফ্রিকান, আফগান, পারস্য (বর্তমান ইরান), বাংলা ও ভারতীয় ইত্যাদি বংশোদ্ভূত মুসলমানরাও এখানে বসতি স্থাপন শুরু করে।তখনও মিয়ানমারে বার্মিজ সাম্রাজ্য (বা বাগান রাজ্য) গড়ে ওঠেনি। কার্যত মিয়ানমারে বার্মিজ সাম্রাজ্য গড়ে ওঠে এগার শতকের মাঝামাঝি সময়ে। ২৫০ বছরের ‘বাগান’ সময়কালেই আজকের মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয়, সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রথম সূত্রপাত ঘটেছিল। ঐ সকল মুসলিমরা মূলত ছিলেন নাবিক, ব্যবসায়ী, সামরিক বাহিনীর সদস্য, যুদ্ধবন্দি, অভিযাত্রী, দাস, উদ্বাস্তু ইত্যাদি। এ সব মুসলমানরা বিভিন্ন বার্মিজ নৃ-গোষ্ঠী যেমন ‘রাখাইন’, ‘শান (বা ‘তাই’)’, ‘কারেন’, ‘মুন’ ইত্যাদির  সাথে আন্তঃবিবাহের মাধ্যমে গড়ে তুলেছে বর্তমান সময়ের মুসলিম গোষ্ঠীসমূহ।

১৮২৬ সালে মিয়ানমার ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে অঙ্গীভূত হয়। কৃষিকাজের জন্য আরাকানের কম জন অধ্যুষিত এবং উর্বর উপত্যকায় আশপাশের এলাকা থেকে বাঙালী অধিবাসীদের অভিবাসন করার নীতি গ্রহণ করেছিল ব্রিটিশরা।  এ সুযোগেই সে সময়ে মিয়ানমারে অধিক সংখ্যায় বাঙালীসহ অন্যান্য  মুসলিমদের আগমণ ঘটে। ১৮৯১ সালে ব্রিটিশদের করা এক আদমশুমারীতে দেখা যায়, আরাকান অঞ্চলে (বর্তমান রাখাইন প্রদেশ) তখন ৫৮,২৫৫ জন মুসলমান ছিল যা ১৯১১ সালে দ্বিতীয় আদমশুমারিতে এসে বৃদ্ধি পেয়ে ১,৭৮,৬৪৭ জনে দাড়ায়। ঐতিহাসিকভাবে বার্মিজরা বরাবরই অভিবাসন-বিরোধী। ব্রিটিশ শাসনামলে এ ধরণের ব্যাপক অভিবাসনে বার্মিজরা অসহায়ত্ব বোধ করত এবং তাই দাঙ্গা-হাঙ্গামার মাধ্যমে তারা অভিবাসীদের উপর প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করত। সংঘাত ক্রমেই ঘনীভূত হতে থাকে। ১৯৩৯ সালে, রোহিঙ্গা মুসলিম ও রাখাইন বৌদ্ধদের মধ্যকার দীর্ঘ শত্রুতার অবসানের জন্য ব্রিটিশ প্রশাসন জেমস ইস্টার এবং তিন তুতের দ্বারা একটি বিশেষ অনুসন্ধান কমিশন গঠন করে। কমিশন অনুসন্ধান শেষে সীমান্ত বন্ধ করার সুপারিশ করে, এর মধ্যে শুরু হয় ২য় বিশ্ব যুদ্ধ এবং এরপরে ব্রিটিশরা আরাকান ছেড়ে চলে যায়। দ্বন্দ্বের সূত্রপাত থেকে সহজেই অনুমেয় যে, এ দ্বন্দ্ব ছিল স্বদেশী বনাম বিদেশী  দ্বন্দ্ব, বার্মিজদের সাথে অভিবাসনকারীদের দ্বন্দ্ব। ঘটনাচক্রে স্বদেশীয়রা ছিল বৌদ্ধ আর অভিবাসনকারীদের মধ্যে মুসলমানই ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ, তাই এ দ্বন্দ্ব ক্রমান্বয়ে রাখাইনের সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধ ও সেখানকার মুসলিম রোহিঙ্গাদের দ্বন্দ্ব নামে আত্মপ্রকাশ করার সুযোগ লাভ করে।

রোহিঙ্গাদের ইতিহাসে প্রথম ভুল বা অদূরদর্শিতা ছিল একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের আশায় বৃটিশদের দ্বারা প্ররোচিত হয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মিত্রপক্ষকে (বৃটিশকে) সমর্থন এবং জাপানী শক্তির বিরোধিতা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানিরা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনস্হ বার্মায় আক্রমণ করে। ব্রিটিশ শক্তি পরাজিত হয়ে ক্ষমতা ছেড়ে চলে যাবার পরে জাপানীরা বার্মিজদের সাথে নিয়ে হাজার হাজার রোহিঙ্গাদের নির্যাতন, ধর্ষণ এবং হত্যা করেছিল।  ১৯৪২ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত মিয়ানমার সাময়িকভাবে জাপানের দখলে ছিল।  এ সময় বৌদ্ধ-মুসলিম এ দাঙ্গা সাময়িক থেকে স্থায়ী রূপ নিতে থাকে, সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ নেয় ১৯৪২ সালে। এ দাঙ্গায় প্রায় এক লক্ষ রোহিঙ্গা মুসলমানকে হত্যা করা হয় বলে উল্লেখ রয়েছে। এ সময় জাপানি এবং বার্মাদের দ্বারা বারংবার গণহত্যার শিকার হয়ে প্রায় ৪০,০০০ রোহিঙ্গা স্হায়ীভাবে চট্টগ্রামেও চলে আসে।

রোহিঙ্গাদের দ্বিতীয় ভুল ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানীদের ফেলে যাওয়া অস্ত্র এবং পরবর্তী সময়ে গোপন পথে অস্ত্র সংগ্রহ করে তৎকালীন পাকিস্তানি ও তুর্কিদের মদদে বৌদ্ধ ধর্মালম্বী রাখাইন অধিবাসী মগদের বিরুদ্ধে ১৯৪৭ সালে ‘মোজাহিদ বাহিনী’ গঠন। এ মুজাহিদ পার্টির লক্ষ্য ছিল আরাকানে একটি স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। এমনকি এরা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তানীদেরকে সহায়তা করেছিল। রোহিঙ্গাদের মুজাহিদ পার্টির এ আন্দোলনও ছিল একটি রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নতুন একটি রাষ্ট্র গঠণের জন্য। শ্রীলংকায় তামিল বিদ্রোহ, আসামে উলফাদের আন্দোলন আর মিয়ানমারে রোহিঙ্গা আন্দোলন একই গোত্রীয় আন্দোলন। চাইলে তাদের এ আন্দোলনকে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন বলা চলে, কিন্তু কোনভাবেই তা ধর্ম রক্ষার জন্য ধর্মীয় কোন আন্দোলন নয়। স্বাধীনতার (৪ জানুয়ারি, ১৯৪৮) পরে মিয়ানমার সরকার মোজাহিদ বাহিনী তথা রোহিঙ্গাদের ‘সন্দেহজনক নাগরিক’ হিসেবে চিহ্নিত করে। ফলে গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব রাষ্ট্রীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে পরিগণিত হয়।এ সূত্রেই ১৯৪৮ থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত তাদের উচ্ছেদের জন্য আটটি সামরিক অভিযান পরিচালনা করে। ফলে রোহিঙ্গারা স্বীয় রাষ্ট্র গঠণের স্বপ্ন ভেঙে নাগরিক অধিকার আদায়ের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে।  এ সময়ে রোহিঙ্গাদের সশস্ত্র প্রতিরোধ আন্দোলনের মুখে মিয়ানমার সরকার তাদের কিছু অধিকার প্রদান করে, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ‘অন্যান্য’ একটি জাতি হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।

১৯৬২ সালে রোহিঙ্গারা পুনরায় নিপীড়ন, নির্যাতন ও উচ্ছেদের শিকার হয়। জেনারেল নে-উইন প্রধানমন্ত্রী উ নু-কে ক্ষমতাচ্যুত করে এবং সামরিক অফিসারদের নিয়ে ‘বার্মা সোশালিস্ট প্রোগ্রাম পার্টি’ গঠন করে বার্মাকে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ঘোষণা করে। আরাকানকে বৌদ্ধশাসিত অঙ্গরাজ্যের মর্যাদা দেওয়া হয়। জেনারেল নে-উইনের সাম্প্রদায়িক নীতির ফলে রোহিঙ্গাসহ আরাকানের অন্যান্য মুসলিম জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে বৌদ্ধদের সাম্প্রদায়িক বিভেদ ও দাঙ্গা প্রকটতর হয়। নিবর্তনমূলক নীতির মাধ্যমে জেনারেল নে-উইন আরাকানে জাতিগত আন্দোলন দমনের জন্য যে নয়টি সামরিক অভিযান পরিচালনা করে তার মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল ১৯৭৮ সালের ‘নাগামিন ড্রাগন অপারেশন’। এর মাধ্যমে মিয়ানমারের বিদ্রোহী সংগঠন ‘আরাকান ন্যাশনাল লিবারেশন পার্টি’র সঙ্গে রোহিঙ্গা মুসলমানদের সম্পৃক্ততার কারণে নির্বিচারে হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে হত্যা করা হয়। এ অপারেশনের ফলে প্রায় ২ লাখ রোহিঙ্গা মুসলমান উদ্বাস্ত্ত বাংলাদেশে প্রবেশ করে। বাংলাদেশ ছাড়াও উল্লেখযোগ্য সংখ্যার রোহিঙ্গারা পাকিস্তানের করাচিতে চলে যায়।উদ্বাস্ত্ত সমস্যার দ্রুত সমাধানের জন্য বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ কামনা করে। জাতিসংঘসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক ফোরামের চাপের মুখে নে-উইন সরকার রোহিঙ্গা উদ্বাস্ত্তদের ফিরিয়ে নিতে সম্মত হয়। দুদেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী ১৯৭৯ সালের ৬ অক্টোবর থেকে ২৪ ডিসেম্বরের মধ্যে রোহিঙ্গা উদ্বাস্ত্তরা স্বদেশে ফিরে যায়। অবশ্য তখনও ১৫ হাজার রোহিঙ্গা মুসলমান বাংলাদেশে থেকে যায়। নে-উইন ১৯৮২ সালে নাগরিকত্ব আইনের মাধ্যমে ১৯৮৩ সালের পর রোহিঙ্গাদের ‘ভাসমান নাগরিক’ হিসেবে ঘোষণা করেন। ফলে বার্মায় রোহিঙ্গাদের সম্পত্তি অর্জন, রাজনৈতিক অধিকার ও অবাধ বিচরণ নিষিদ্ধ হয়ে যায়।

রোহিঙ্গাদের তৃতীয় রাজনৈতিক অপরিণামদর্শিতা ছিল ১৯৯০ সালের মে মাসে মিয়ানমারের সাধারণ নির্বাচনে অং সাং সুচির নেতৃত্বাধীন ‘ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্র্যাসি’কে (এনএলডি) সমর্থন দান। গণতন্ত্রের জন্য এ সমর্থন কোন ভুল সিদ্ধান্ত না হলেও নির্বাচন পরবর্তী সময়ে ক্রমে ক্রমে তা ভুলের আঁচলেই ঢাকা পড়ে গেছে। এ নির্বাচনে এনএলডি ৯০% আসনে জয়ী হয়। আরাকানের ২৩টি নির্বাচনী এলাকায় ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্র্যাসি একচেটিয়া প্রাধ্যান্য লাভ করে। তবে, ‘জেনারেল স মং নির্বাচনে বিজয়ী দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে অং সাং সু চি-কে গৃহবন্দি করেন এবং সু চি-র প্রতি একচেটিয়া সমর্থন প্রদানের কারণে স মং-এর নির্দেশে সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা মুসলমানসহ গণতান্ত্রিক আন্দোলনে জড়িত রাখাইনদের উপর ব্যাপক নির্যাতন শুরু করে। নববইয়ের নির্বাচনী ফলাফল ও রোহিঙ্গা বিরোধী অপারেশনের ফলে ১৯৯১ সালের ২৬ জুনের মধ্যে ২,৫০,৮৭৭ জন রোহিঙ্গ্যা মুসলমান আরাকান থেকে বিতাড়িত হয়ে চট্টগ্রাম অঞ্চলের ১৯টি শরণার্থী শিবির এবং শিবিরের বাইরে আশ্রয় নেয়। মায়ানমার সরকার ২,৩১,২৭৯ জন রোহিঙ্গাকে তাদের দেশের নাগরিক বলে স্বীকার করে। দুদেশের সরকারের মধ্যে ১৯৯২ সালের ২৮ এপ্রিল এক সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী ১৯৯২ সালের ১৫ মে থেকে ৬ মাসের মধ্যে শরণার্থীদের ফিরিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার করলেও অদ্যাবধি প্রায় ২২ হাজার শরণার্থী প্রত্যাবসনের অপেক্ষায় কক্সবাজার জেলার উখিয়া থানাধীন কুতুপালং এবং টেকনাফ থানাধীন নয়াপাড়া শরণার্থী শিবিরে অবস্থান করছে। বাংলাদেশ হতে তাদেরকে দফায় দফায় তাদের স্বদেশ মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন করা হচ্ছে।

সুচীর মুক্তির পরে রোহিঙ্গাদের সেই সিদ্ধান্ত আরো অধিক মাত্রায় ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। ১৯৮৮ সালে অং সান সূচিকে রাজনীতিতে আনার ক্ষেত্রেও রোহিঙ্গা মুসলিম লেখক ও রাজনীতিক ‘মং থু কা’র (বা ‘নূর মোহাম্মদ’) ভূমিকা ছিল। তিনি পরে এনএলডির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হন। বিশ্বব্যাপী অসংখ্য মানুষকে গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরিয়ে আনতে, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার আদায়ে এবং মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ক্লান্তিহীন সংগ্রামের জন্য অত্যাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রতীক সুচিকে ১৯৯১ সালে (গ্রহণ করেন ২০১২ সালে) শান্তিতে নোবেল দেয়া হয়।  তবে সুচি শান্তির কোন বারতা বয়ে আনতে পারেননি রোহিঙ্গাদের জন্য। গণহত্যা এড়ানোর অজুহাতে, রাজনৈতিক ঝুঁকি থেকে নিরাপদে থাকতে বা মিয়ানমারের উগ্র বৌদ্ধপন্থি নেতা আসিন উইরাথুর (ওরফে ‘বার্মিজ বিন লাদেন’) আগ্রাসনের ভয়েই হোক সুচী রোহিঙ্গাদের ভাগ্যে কোন পরিবর্তনের সৌভাগ্য রেখা আঁকতে পারেনি। তিনি বরং ২০১৩ সালে বিবিসির মিশাল ‍হুসেনকে দেয়া সাক্ষাৎকারে সহিংসতার জন্য রোহিঙ্গাদেরই দায়ী করেন। তিনি বলেছিলেন, এটা ঠিক যে, রোহিঙ্গারা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, আবার একথাও মিথ্যা নয় যে, বৌদ্ধরাও সহিংসতার শিকার হচ্ছে। এখন সুচির লক্ষ্য একটাই, মিয়ানমারের আগামী সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হওয়া। মিয়ানমার রাষ্ট্র ও রোহিঙ্গাদের যে দ্বন্দ্ব কালে কালে বৌদ্ধ-মুসলিম দ্বন্দ্বের তকমায় রঙ ছড়ানো হয়েছে, সেই রঙই সুচির কাছে এ বিষয়ে কোন সহানুভূতি দেখানোর পথে, সমাধান খোঁজার পথে অন্তরায় হয়ে দাড়িয়েছে।  ৮৯% বৌদ্ধ অধ্যুষিত এই দেশে কোন কোন বৌদ্ধ নেতা নির্বাচনকে সামনে রেখে এমন দুঃসাহস দেখাবে বলে মনে হয় না।

রোহিঙ্গাদের চতুর্থ সমস্যা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে ২০১২ সালে যখন সংঘবদ্ধ কয়েকজন মুসলিম রোহিঙ্গা যুবকের হাতে একজন বৌদ্ধ নারীর ধর্ষিত ও নিহত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে জুন – অক্টোবরে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষ শুরু হয়। অত্যাচারের সুযোগের অপেক্ষায় থাকা রাখাইন বৌদ্ধরা এ ঘটনার সদ্ব্যবহার করে। পাঁচ মাস ধরে চলা এ সংঘর্ষে বহু রোহিঙ্গা গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হয়, শতাধিক লোক নিহত এবং লক্ষাধিক লোক বাস্তুচ্যুত হয়।সে সময় বাংলাদেশের সীমান্তে কড়াকড়ি থাকায় অধিকাংশ রোহিঙ্গা পালিয়ে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নেয়। যারা বাইরে যেতে পারেনি, তাদেরও ঠাঁই হয় বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে। ধর্মীয় প্রচারণার ফলে ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে রোহিঙ্গাদের ধর্ষণ–হত্যা পাপের আঁচ লাগে বাংলাদেশেও। মুসলমানদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরান শরীফ নিয়ে, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর অবমাননা করে কথিত এক বৌদ্ধ যুবক কর্তৃক ফেসবুকে ছবি পোস্টকে কেন্দ্র করে কক্সবাজারের রামু, উখিয়া ও চট্টগ্রামের পটিয়ায় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরাদের বসতি, মন্দির ও বিহারে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। ফলে বিশ্ব অঙ্গনে বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক ভাবমূর্তি সঙ্কটে পড়ে ।

বাংলাদেশ এবং মিসয়ানমার থেকে জীর্ন কিছু নৌকায় চড়ে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়ায় পাড়ি দেয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে এ বছর রোহিঙ্গা সমস্যা পুনরায় বিশ্ব রাজনৈতিক আলোচনার প্রাধান্য পায়। খবরে প্রকাশ, ২০১৫ সালের জানুয়ারী থেকে মার্চ পর্যন্ত প্রায় ২৫,০০০ রোহিঙ্গা এ পথে পাড়ি জমিয়েছেন বা পাচারের শিকার হয়েছেন যাদের মধ্যে কিছু সংখ্যক ইন্দোনেশিয়ায়, মালেশিয়ায়, এবং থাইল্যান্ডে মৃত্যুমুখে পতিত হয়। ব্যাপারটি আরো গুরুতর হয়ে ওঠে যখন  থাইল্যান্ডের একটি দূর্গম পাহাড়ে ৩২টি ও মালয়েশিয়ায় পুলিশ দেশটির সীমান্ত অঞ্চলে ১৩৯ টি গণকবরের সন্ধান পায়। এ পাচার থেকে বেঁচে যাওয়া স্বাক্ষীদের ভাষ্যমতে এ সকল গণকবরের অধিকাংশই মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা বা পাচারের শিকার হওয়া রোহিঙ্গাদের।এ অভিযোগগুলো প্রমাণিত হয় সমুদ্রে ভাসমান অভিবাসী রোহিঙ্গাদের উদ্ধারকার্য থেকে।

চলমান রোহিঙ্গা সঙ্কটের পিছনে রোহিঙ্গাদের দুইটি রাজনৈতিক ভুল, একটি রাজনৈতিক অপরিণামদর্শিতা ও একটি পাপ রয়েছে- দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বৃটিশদের সমর্থনে জাপানি তথা বৌদ্ধদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগদান, আন্তর্জাতিক ধর্মীয় রাজনীতির শিকারে পরিণত হয়ে মোজাহিদ বাহিনী নামক ধর্মভিত্তিক বিচ্ছিন্নতাবাদী গঠণ করে স্বাধীনতাকামী আন্দোলন পরিচালনা, মিয়ানমারের গণতন্ত্রের আন্দোলনে সুচির এনএলডিকে সমর্থন দান এবং বৌদ্ধ রমনীকে বলাৎকার ও হত্যা। ইতিহাসের ঘটনা পরম্পরায় বিচার্য যে, রোহিঙ্গাদের কোন আন্দোলন কখনোই ধর্মীয় আন্দোলন ছিল না, ধর্ম রক্ষার্থে কখনো তারা কোন সংগ্রাম করেনি। বরং প্রতিটি কর্মকাণ্ডে তারা বিচ্ছিন্নতাকামীর পাশাপাশি ধর্মীয় উগ্রপন্থি হিসেবে নিজেদের আত্মপ্রকাশ ঘটিয়েছে। ফলে, কালে কালে সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে তারা ‘বামার’ বা বার্মিজদের থেকে অনেক দূরে সরে গেছে। বার্মিজদের জাতিসত্ত্বাবোধ এতটাই প্রবল যে, ‘বার্মা’ থেকে ‘মিয়ানমার’ নাম পরিবর্তনের  সিলভার জুবিলি পার হয়ে গেলেও বার্মিজদের দেশ হিসেবে বার্মা নামটি এখন পর্যন্ত বহাল রয়েছে।

বার্মিজ-রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীগত সংঘাত তো এমনিতেই ভয়াবহ ছিল। তদুপরি, যে সকল চাঁদ-তারার ঝাণ্ডাবাহী ও বিভিন্ন দেশে তাদের ‘উপ-ভ্রাতা’গণ এ সংঘাতকে বৌদ্ধ-মুসলিম সংঘর্ষের লেবাসে জনারণ্যে প্রচারাভিযান চালিয়েছেন তাদের মনোবাঞ্ছা আর যা-ই হোক না কেন, তারা কোনদিনও রোহিঙ্গাদের শুভাকাঙ্খী ছিলেন না। তারা বরাবরই বিরোধকে দ্বন্দ্বে, দ্বন্দ্বকে সংঘাতে আর সংঘাতকে সংঘর্ষে রূপান্তরিত করেছে- সরল, ধর্মপ্রাণ মানুষকে ধোঁকা দিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লুটেছে।

 অতি সাম্প্রতিককালে মিয়ানমারে বার্মিজরোহিঙ্গা কোন জাতিগোষ্ঠীগত সংঘর্ষ হচ্ছে না। তারপরেও ঐ সকল উপভ্রাতাগণ ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শ্রীলংকার তামিল হত্যাকাণ্ড, সিরিয়া, ইয়েমেন, আফ্রিকা বা অন্যান্য অঞ্চলের বিভিন্ন সময়ে ঘটে যাওয়া হত্যাকাণ্ড, দুর্ঘটনা, শ্মশানের লাশ পোড়ানো ইত্যাদি ছবি ও তিব্বতীয় বৌদ্ধ ধর্মগুরুদের বিভিন্ন ভিডিও কম্পিউটারে পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও পরিমার্জন করে প্রচার করছে। এ ধরণের চক্রান্ত উদ্দেশ্যহীন হতে পারে নাআমাদেরকে অবশ্যই কক্সবাজারের রামু, উখিয়া ও চট্টগ্রামের পটিয়ায় সাম্প্রদায়িক হামলার কথা মনে রাখতে হবে। 

=============

তথ্যসূত্রঃ বাংলাপিডিয়া, পত্র-পত্রিকা, বিভিন্ন ব্লগ ও মিয়ানমারের উপর লেখা কিছু গবেষণাধর্মী গ্রন্থাবলী

 ফেসবুক পেজ- আলাউদ্দীন ভুঁইয়া