ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

গুলশানে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ জঙ্গি হামলার পর আতঙ্কের নতুন মাত্রায় আক্রান্ত সবাই, সন্দেহ নেই। বাংলাদেশে আইএস-এর অস্তিত্ত্ব নেই বলে সরকারের মুখপাত্রগণ এতোদিন যেসব জোরালো বক্তব্য দিয়েছেন তারাও এবার নড়েচড়ে বসেছেন। তৎপর হয়েছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত বাহিনী। এতোগুলো মৃত্যুকে ঠেকানো যেতো কিনা, তার চেয়ে বরং সম্ভাব্য বিপদ মোকাবেলায় আমাদের ভূমিকা কী হবে সেটি অবশ্যই বেশি গুরুত্ববহ। তবে জঙ্গি বাহিনীর অস্তিত্ত্ব-অনস্তিত্ত্ব নিয়ে রাজনৈতিক কানামাছি এদেশে বেশ জনপ্রিয় খেলা– সে বিষয়টি কিন্তু আবারও প্রমাণিত হলো। বিএনপি জোটের সরকারের আমলেও বাংলা ভাই নামে আসলে কেউ নেই, সব মিডিয়ার সৃষ্টি -এমনটিই বলা হয়েছিলো। এখন কথা হলো, অনেক ব্যাঙের উৎপাত যে ঘরে, সেখানে দুয়েকটা সাপের অস্তিত্ব আপাতভাবে যেমন ওয়েলকামিং মনে হতে পারে, তেমনি ফসলের ক্ষেতে উরচুঙ্গাকে কৃষকের বন্ধু ভাবা যেতে পারে। জঙ্গি তৎপরতাও রাজনৈতিক অঙ্গনে ক্ষমতাধরদেরকে নানারূপ সুবিধা দিয়ে থাকে। সাপের কামড়, কিংবা উরচুঙ্গার ধানপাতা খাওয়া শুরু না হওয়া পর্যন্ত ওই ঘরবাসি বা ওই কৃষকের টেনশনের কিছু নেই।

.

জঙ্গি হামলায় মাদ্রাসা ছাত্র ব্যবহার করা হলে ওরা শুয়োরের বাচ্চা, আর ইংলিশ মিডিয়ামের ছাত্র হলে বাচ্চা মানুষ–এই ব্যাপারটিতে আপনি স্থূল ক্লাস সচেতনতা পাবেন, কিন্তু হলিস্টিক কোনো দৃষ্টিভঙ্গির উপস্থিতি এখানে নেই। এদেশে প্রগতিশীলদের কোনো অংশের কাছে যদি মাদ্রাসায় পড়ুয়াদেরকেই এক্সক্লুসিভলি আনকালচার্ড, ইজি-টু-আবিউজ এবং জঙ্গি ব্যবহারোপযোগি মনে হয়ে থাকে এতোদিন, এবার সে ভুল ভেঙেছে নিশ্চয়ই। কিন্তু শিশু-কিশোরদেরকে অপরাধমূলক কাজে জড়িত করার সংস্কৃতি এদেশে নতুন কিছু বলে মনে হয় কি? পিকেটিংয়ে, ড্রাগ ডিলিংয়ে, ঝুঁকিপূর্ণ মেশিন অপারেটিং কিংবা যৌন ব্যবসায় শিশুদের ব্যবহার তো সেই কবে থেকেই হয়ে আসছে। আমরা কি ভুলে গেছি, এদেশে জাতীয় পুরস্কার পাওয়া একজন শিশুসাহিত্যিক শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করার নামে কীভাবে বস্তির কিশোরীদেরকে দিয়ে পর্নো ছবি বানিয়ে বিদেশে রপ্তানি করেছে দিনের পর দিন? ভুলে গিয়ে থাকলে এই লেখাটি দেখে নেওয়া যেতে পারে।

.

জঙ্গিবাদের মাস্টারমাইন্ড যারা, তারা একই সাথে যথেষ্ট বিদ্বান, ধূর্ত, মেধাবি ও মূর্খ হয়ে থাকে–এটা ওসামা বিন লাদেন সম্পর্কে পড়তে গিয়ে খুব ভালো করে জানা হয়েছে আমার। আমরা জানি, টুইন টাওয়ার হামলার সমসাময়িক কাল থেকে বাংলাদেশেও জঙ্গিবাদ ব্যাপকভাবে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। ওই সময়ে বিএনপি জোট সরকারের প্রত্যক্ষ মদদে বাংলাদেশে ইসলামের নামে ছড়িয়ে পড়া জঙ্গিবাদ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও উজ্জ্বল(?) হয়ে ওঠে। তখনকার ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টিকারি দুই শীর্ষ জঙ্গি নেতা শায়খ আব্দুর রহমান ও বাংলা ভাইকে নিয়ে যখন পত্রিকাগুলো ‘বিচি খোলা’ রিপোর্ট প্রকাশ করতে থাকলো, তখন জঙ্গি নেতারা যে যেনোতেনো কেও নয় –এ ব্যাপারটি আরও স্পষ্ট হয়েছিলো।

.

উত্তরাঞ্চলে হত্যা-নির্যাতনের মাধ্যমে ভয়ংকর ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে বাংলা ভাই। জাগ্রত মুসলিম জনতা বাংলাদেশ-এর প্রধান ও জামা’আতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি)’র অপারেশনাল চিফ এই বাংলা ভাই ওরফে সিদ্দিকুল ইসলাম নাকি এক সময় বাংলা পড়াতো এবং খুব ভালোই পড়াতো।

.

আওয়ামী লীগ নেতা মির্জা আজমের ভগ্নিপতি শায়খ আব্দুর রহমান ১৯৮৫ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত সৌদি এম্ব্যাসিতে কাজ করে বলে জানা যায়। এরপর সে মদিনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যায়। পরবর্তিতে আফগানিস্তান, পাকিস্তান হয়ে ভারত হয়ে বাংলাদেশে আসে এবং ইসলামি খেলাফত প্রতিষ্ঠায় আত্মনিয়োগ(!) করে। জানা যায়, বাংলা ভাই এবং শায়খ আব্দুর রহমান দুজনই একসময় জামায়াতে ইসলামীর সদস্য ছিল।

.

বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের উত্থানের পর দেড় দশক পার হয়েছে। জঙ্গিবাদকে ব্যবহার করে এদেশের সরকারগুলো নিজেদের স্বার্থ হাসিল করেছে, জনগণকে বিভ্রান্ত করেছে নানা সময়ে। জজ মিয়া নাটকের কথা আমাদের নিশ্চয়ই মনে আছে।২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের জনসভায় পৈশাচিক গ্রেনেড হামলার ঘটনার কয়েক মাস পর বিএনপি সরকার এ ঘটনার জন্য জজ মিয়া নামক একজনকে দায়ী করে সংবাদমাধ্যমে হাজির করে।(লিঙ্ক দেখুন)

.

বছর খানেক আগে চট্টগ্রামের লালবাগ এলাকায় যুবদলের কেন্দ্রীয় এক নেতার বাসায় অভিযান চালিয়ে পুলিশ ৭৪টি হাতবোমা (ককটেল) জব্দ করেছে। পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরকও জব্দ করা হয়েছে। পুলিশ বলেছে, এ বিস্ফোরক দিয়ে প্রায় দেড় হাজার বোমা তৈরি করা যেত।(নিউজ লিঙ্ক)

.

২০০০ সালে তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কোটালীপাড়ার জনসভাস্থলের খুব কাছে ৭৬ কেজি ওজনের শক্তিশালী দুটি দূরনিয়ন্ত্রিত বোমা পুঁতে রাখা হয়। পরে বোমা দুটি উদ্ধার করা হয়। এছাড়া সে সময় গোপালগঞ্জ শহরের বিসিক শিল্প নগরীতে সাবান ফ্যাক্টরির আড়ালে বোমা তৈরির কারখানারও সন্ধান পাওয়া যায়। সেসময়ে এ হত্যা চেষ্টার প্রধান আসামি মুফতি হান্নান আদালতে দাঁড়িয়ে যা বলেছিলো সেটিও মানুষকে অবাক করেছে। (লিঙ্ক দেখুন)

.

অতীত কাসুন্দি ঘেঁটে লাভ নেই জানি, তবু পশ্চাদপ্রবণ দেশের নাগরিক হিসেবে খসলত বদলাতে পারা একটু মুশকিল বলেই হয়তো হুহু করে এসব মনে পড়ে গেলো। যা হোক, কথা হচ্ছিলো জঙ্গিবাদি হামলায় শিশু-কিশোরদেরকে ব্যবহার করা নিয়ে। হ্যাঁ, কোনো সন্দেহ নেই, এদেরকে ব্রেইন ওয়াশ করা হয়। এখন এ বিষয়টি সকলের কাছেই স্পষ্ট যে, এই ব্রেইন ওয়াশের শিকার যেকোনো স্ট্যাটাসওয়ালা পরিবারের শিশু-কিশোরদেরকেই করা সম্ভব। জঙ্গি মাস্টারমাইন্ড যারা, তারা একাজে সিদ্ধহস্ত। “The guerrilla must move amongst the people as a fish swims in the sea”-মাও সে তুং-এর এই বিখ্যাত উক্তির পুঙ্খানুপুঙ্খ বাস্তবায়ন আমরা দেখতে পেলাম যখন সর্বসাম্প্রতিক হামলায় অংশ নেওয়া আত্মঘাতিদের পরিচয় পাওয়া গেলো। এরা নিশ্চিতভাবেই এসব মাস্টারমাইন্ডদের তৈরি স্লিপার সেলের সদস্য ছিলো, যারা হামলা করার পূর্ব মূহুর্ত অবধি সাধারণ মানুষের সাথে স্বাভাবিকভাবেই সুবোধ ছেলে হয়ে বাস করেছে। স্লিপার সেল কী–এ সম্পর্কে ব্লগার মোঃ আলাউদ্দিন ভূঁইয়া তাঁর সাম্প্রতিক এক লেখায় তুলে ধরেছেন, যা এখানে উদ্ধৃত করছিঃ “স্লিপার সেল হলো এমন একটি ঘাতকের দল যারা যতক্ষণ না আক্রমণ করে ততক্ষণ পর্যন্ত তাদেরকে সনাক্ত করা খুবই মুশকিল। এরা তাদের নিয়ন্ত্রণকারী সম্পর্কে অজ্ঞাত থাকে, তারা জানে তাদেরকে একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ’ কাজ করতে হবে কিন্তু শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত জানে না সে কাজটা কি। নির্দেশ প্রদানের অল্প কিছুকাল আগে এরা স্বাভাবিক জীবনযাপন থেকে নিজেদেরকে সরিয়ে নেয় এবং সম্পূর্ণভাবে আধ‍্যাত্মিকতার পরজীবী হয়ে ওঠে।  পারলৌকিক মোহাবিষ্ট এ সকল সদস‍্যদেরকে নির্দেশের সাথে সাথে ‘অপারেশনে’ যেতে হয়; অর্থাৎ নির্দেশ প্রদান ও কার্যসম্পাদনের মাঝে সময় এতটাই কম থাকে যে তখন তাদের স্বাভাবিক বিচারবুদ্ধি সক্রিয় হয়ে ওঠার আগেই এরা কাজটি করে ফেলে।  টার্গেট কিলিংয়ে তাই স্লিপার সেলের সদস‍্যকে ব‍্যবহার করা হয়।”

.

অনেকেই অনেক জ্ঞানগর্ভ সাজেশন দিচ্ছেন কী করলে বাংলাদেশকে এ ধরণের ভয়াবহ জঙ্গিবাদের আগ্রাসন থেকে বাঁচানো যাবে, ঠেকানো যাবে আমাদের কোমলমতি এসব শিশু-কিশোরদের জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার সমূহ সম্ভাবনাকে। শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের কথা বলছেন কেউ কেউ। প্রাইমারি, এবতেদায়ি কিংবা কওমি মাদ্রাসা থেকে শুরু করে ইউনিভার্সিটি পর্যন্ত সকল স্তরের শিক্ষা ব্যবস্থায় সুদক্ষ মনিটরিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করার কথা বলা হচ্ছে। স্কুল-কলেজের শিশুদের পরিবারগুলোর খোঁজ-খবর নেওয়া, তাদের সাথে নিয়মিত মত বিনিময় করার পাশাপাশি ধর্মীয় গোঁড়ামি দূর করতে সামাজিক আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তাও উঠে এসেছে এসব পরামর্শে। এগুলো নিঃসন্দেহে চমৎকার পরামর্শ এবং এগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে যা কোনোদিন হবার নয় তা হতে দেরি হবে না নিশ্চয়ই।

.

কিন্তু প্রশ্ন হলো এসব হওয়াবে কে? রাজনীতিবিদরাই তো? যে দেশে প্রতিনিয়ত বিচার বহির্ভূত হত্যাকে প্রশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে সরকার, যে দেশে বিচার চেয়ে সারা দেশ জুড়ে জনগণের এতো আন্দোলনের পরেও এতোগুলো ভয়ানক হত্যাকাণ্ডের (সাংবাদিক, সাহিত্যিক, শিক্ষক, ব্লগার, ছাত্র, নাট্যকর্মি আরও কতো কতোজন) একটিরও বিচার হয়নি আজ অবধি, বরং বিচারের নামে নতুন নতুন তালবাহানা, নতুন নতুন নাটক দেখতে হয়েছে আমাদের, যে দেশে একজন পুলিশ সদস্য পর্যন্ত নিজের স্ত্রী হত্যার বিচার পাওয়ার পরিবর্তে উলটো নিজের চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে পড়ে, যে দেশে রাজনৈতিক প্রভাবে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ঘৃণ্য আসামির দণ্ড মওকুফ করে দেওয়া হয়, যে দেশে শিক্ষকের চাকরি পেতে, এমনকি স্কুলে শিশু ভর্তি করাতে ঘুষ দিতে হয়, যে দেশে অতি প্রবীণ এবং সর্বজনশ্রদ্ধেয় রাজনীতিকও মন্ত্রিত্ব পেয়ে চোরা বেড়ালের খ্যাতি অর্জন করে নিতে পারেন–সে দেশে জঙ্গিবাদের চাষ করা যায় খুব সহজেই, কিন্তু জঙ্গিবাদকে দূর করার স্বপ্ন দেখা সহজ ততোটা নয়। নৈতিক ভিতের উপর যদি একটি দেশের সরকার নিজেই দাঁড়াতে না পারে, তবে আদর্শের শিক্ষা দিয়ে প্রজন্মকে সুন্দরের পথ দেখাবে কারা?

.

আমরা খুব অদ্ভুত জাতি। এতো কিছুর পরেও চুপটি করে থাকি, ধৈর্য ধরি, আস্থা রাখি, স্বপ্ন দেখি, গান গাই, শহীদ মিনারে যাই, বছর বছর জনসংখ্যা বাড়াই, বেকার বড়াই। আমাদের প্রজন্মও স্বপ্ন দেখে, স্বপ্ন দেখে। যে ছেলেগুলো বাংলার জমিনে খিলাফত প্রতিষ্ঠা করবে বলে গুলশানের ওই রেস্টুরেন্টে ঢুকে এতোগুলো মানুষ মেরে নিজেরাও মরে গেলো, স্বপ্ন ওরাও দেখেছিলো। স্বপ্ন দেখে গুম হওয়া সন্তানের বাবা-মা, স্বপ্ন দেখে হাড্ডিসাড় পথশিশু, অসুস্থ ভিখিরি, দরিদ্র চাষা, ছাত্র-শিক্ষক, ধনী ব্যবসায়ি, তরুণ উদ্যোক্তা, চৌকষ আমলা, রাজনীতিক এবং বাকি সবাই। খুব ইচ্ছে হয়, হরেক মানুষের হরেক স্বপ্নের এতো এতো ভিড় ছাপিয়ে কোনো এক বেঘোর ঘুমের রাতে স্বপ্নে জাতির জনককে একটিবার দেখতে পাবো, আর তাঁকে জিজ্ঞেস করবো, “পিতা, আপনি এখন কেমন আছেন?”