ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

এরপর গেলাম একটা হোটেলে, কিছু জল খাবার করার জন্য। কানাই সারাদিন বাইরে ছিল, ভাত খাওয়া হয় নাই। তাই এই সন্ধ্যায় হোটেলে ঢোকা।

কানাই হোটেলে বসে আমাকে জিজ্ঞেস করল, ‘কী খাবি?’
আমি বললাম, রাতের খাবার তো বাসাই খাবো, এখন আর কী খাওয়া যায় ভাবছি!
কানাই বলল, ‘ওইসব কিছু ভাবা দরকার নাই, রাতে বাসার খাবার কপালে জোটে কি না সন্দেহ আছে। যা খাবার এখান থেকে খেয়ে নে।’
আমি বললাম, তা জোটোক আর না জোটোক, তাতে সমস্যা নেই। এখন হাল্কা পাতলা কিছু খেলেই হবে।
কানাই বলল, ‘তা হলে বল, কী খাবি?’
আমি বললাম, এক প্লেট ভূনা-খিচুড়ি খাব।
কানাই বলল, ‘ঠিক আছে তা-ই হবে।’

কানাই হোটেল-বয়কে দুই প্লেট ভূনা-খিচুড়ির দিতে বলল। মুগডাল দিয়ে রান্না করা ভূনা-খিচুড়ি, সাথে ছোট-ছোট টুকরা করা মুরগির মাংস। হোটেলটা অনেক বড়, ধর্মতলার মধ্যে এই হোটেটাই সবার কাছে খিচুড়ির জন্য সুপরিচিত। খিচুড়ি খেয়ে হোটেল থেকে বাইর হয়ে দুইজনে গেলাম বাসস্ট্যান্ড। এখান থেকে উত্তরবঙ্গ, দক্ষিণবঙ্গ, সব বঙ্গের বাসই ছাড়ে। কানাই উত্তরবঙ্গের বাসের একজন হেলপারের সাথে আলাপ করল। জলপাইগুড়ি বীরপাড়ার ভাড়ার বিষয়েও জানল। এখান থেকে কখন বাস ছেড়ে যায়, সে বিষয়েও খবর নিল। এরপর আশে-পাশের অনেক জায়গায় ঘুরা হলো। এই ঘুরাঘুরির মধ্যেই রাত হয়ে গেল প্রায় ১০ টার মতো। এবার বাসায় ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছি দুইজনে।

ধর্মতলা থেকে অটোরিকশা করে আসলাম বাঘা যতীন। কানাই অটোরিকশা থেকে নেমেই একটা চা-দোকান থেকে দুইটা পাউরুটি কিনল। পাউরুটি কিনল এই কারণে যে, যদি বাড়িওয়ালার ঘর বন্ধ থাকে, তাই। বাড়ি গেলাম, বাড়ি নীরব। কেউ মনে হয় সজাগ নেই, সবাই ঘুমে বিভোর। দুইজনে কুয়ারপাড় গিয়ে হাত-মুখ ধুলাম, ঘরে এসে জামাকাপড় ছড়লাম। কানাই সাথে নেওয়া পাউরুটি দুটো বিছানার উপর রাখল।

পাউরুটি দুটো দেখে আমি কানাইকে বললাম, কি রে, রুটি দুটো এভাবে ফেলে রাখলি যে?
কানাই আমাকে বলল, ‘আয় একসাথে বসে খাই!’
আমি বললাম, আমি এখন আর কিছুই খেতে পারবো না, তুই একটা খেয়ে আরেকটা রেখে দে। সকালে কাপড় নিয়ে মহল্লায় যাবার আগে খেয়ে যাবি।
কানাই বলল, ‘তুই খাবি না কেন? খেতে হবে, আয় শিগগির। তুই না খেলে আমিও খাব না।’
আমি বললাম, কী আর খাব রে কানাই, আমার কিছুই ভালো লাগছে না। না বুঝে, আর না শুনে হুর করে চলে এলাম, এখন তো দেখছি কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। আমি তোর সাথে ঘুরছি, ফিরছি, খাচ্ছি। জানি না দেশে ওরা কী খাচ্ছে, কী করছে, কেমন আছে। ওদের কথা আমার বার-বার মনে পড়ছে! এখন যে কী করি! ভেবেই পাচ্ছি না। তুই আমাকে যে ভাবেই পারিস, আমার দিদির বাড়িতে পৌঁছে দে। দেখি সেখানে গিয়ে কিছু করা যায় কি-না।

আমার কথা শুনে কানাই কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। আমি এক গ্লাস জল ঢালছি পান করার জন্য। তা কানাই চেয়ে-চেয়ে দেখছে, কিচুই বলছে না। আমি জল পান করে খাটে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম।
এমন সময় কানাই আমার হাত চেপে ধরে বলল, ‘দেখ তোকে নিয়ে আমিও খুব চিন্তায় আছি। রতন চক্রবর্তীর কথা শুনে কেন-ই-বা তোকে আমার সাথে আনলাম, সেই চিন্তাই করছি। তুই সাংসারিক মানুষ, এভাবে তোকে আমার সাথে এখানে আনা ঠিক হয়নি। এখন তোকে তোর দিদির বাড়ি পাঠালে, যদি তোর দিদি তোকে চিনতে না পারে? যদি তোর দিদিকে তুই চিনতে না পারিস? তা হলে তো অবস্থা আরও খারাপ হবে। এখন তুই যা সিদ্ধান্ত নিবি তা-ই হবে। এখানে আমি থাকি ভাড়া, বর্তমানে সাথে এখন উপযুক্ত দুই বোন। তোকে এখন আমার সাথে রাখতেও পারছি না, আবার তাড়িয়ে দিতে পারছি না। এখন তুই বল আমি কী করবো।’
আমি বললাম, আমার সাথে ৫০০ টাকার মতো অবশিষ্ট আছে। এই টাকা থাকতে-থাকতে তুই আমাকে আমার দিদির বাড়ি পৌঁছে দে। দিদি, জামাইবাবু ও ভাগিনাদের সাথে বুঝে দেখি কিছু করা যায় কি-না। আমার বিশ্বাস, দিদি আমাকে ফেলে দিবে না, আর ভাগিনারাও আমাকে নিয়ে বিরক্ত হবে না। যদিও জীবনে কোনও দিন দিদির বাড়ি যাইনি, তাতে কী হয়েছে? ফেলবে না।
আমার কথা শুনে কানাই বলল, ‘আচ্ছা তা-ই হবে। আগামী পরশুদিন আমি তোকে জলপাইগুড়ির বাসে উঠিয়ে দিচ্ছি। তুই তোর বড়দিদির বাড়ি গিয়ে দেখ কিছু করতে পারিস কি-না।’
আমি বললাম, ঠিক আছে তা-ই কর। দিদির বাড়ি পৌঁছে আমি তোকে চিঠি দিয়ে জানাবো।
কানাই বলল, ‘ঠিক আছে তা-ই হবে। এখন আয়, একটা রুটি খেয়ে নে।’
কানাইর কথামত একটা পাউরুটি খেলাম, কানাইও খেল।
খাওয়া শেষে কানাই আমাকে জিজ্ঞেস করল, ‘তোর কাছে এখন টাকা আছে কত?’
আমি বললাম, পাঁচশো টাকা পুরো হবে না, কিছু কম হতে পারে।
কানাই বলল, ‘এই টাকা থেকে আর একটা টাকাও খরচ করবি না। দুই চার পয়সা যা লাগে আমার কাছে চেয়ে নিবি, আমি দিবো। জলপাইগুড়ি যাওয়ার পর হঠাৎ করে কার কাছে টাকা চাইবি। ভারতের বাড়ি, নিজের কাছে না থাকলে কেউ দিবে না।’
আমি বললাম, সেই বুঝ আমার বোঝা হয়ে গেছে তোর বন্ধুর বাড়ি যাওয়ার পর থেকেই। এখন আমি খুবই হুশিয়ার, অন্তত ভারতে যতদিন থাকবো_ততদিন।
আমার কথা শুনে কানাই বলল, ‘হ্যাঁ তা হলেই এই দেশে কিছু করতে পারবি। এখানে থাকলে, এখানকার মনুষের মতোই চলতে হবে। বুঝলি?’

এক সময় দুজনে ঘুমিয়ে পড়লাম। সকাল যে কখন হয়েছে তা আর আমাদের জানা নেই। কানাইর মেজো বোন দরজার কাড়া নাড়ছে, আর দাদা-দাদা বলে ডাকছে। ওঠলাম ঘুম থেকে, কানাইও ওঠল। ওমা! সকাল ১০ টা বেজে গেল?

ডলি বলল, ‘আজ আর তোমার মহল্লায় যাওয়া হবে না দাদা।’
কানাই বলল, ‘তুই এখন যা, আমি হাত-মুখ ধুয়ে রেডি হচ্ছি। মহল্লায় না গেলে আমার একটু সমস্যা হবে যে।’
আমি বললাম, পকেটে টাকা না থাকলে-তো সমস্যা হবেই। তুই আলসেমি না করে তাড়াতাড়ি করে মহল্লায় যা।
ডলি বলল, ‘দাদা, কাকীমা রুটি বানিয়েছে। তোমাদের দুইজনের জন্য চারটে রুটি নিয়ে আসি?’
কানাই বলল, ‘না থাক, দরকার নাই। আমরা সামনের হোটেল থেকে কিছু খেয়ে নিবো, তুই যা।’ ডলি চলে গেল, কানাই তাড়াতাড়ি করে হাত-মুখ ধুয়ে আসলো। আমি ওর আগেই হাত-মুখ ধুয়ে বসে আছি। বিক্রি করার মতো কাপড়গুলো নেওয়ার জন্য ভ্যানগাড়ি আগেই রেডি থাকে। মহল্লায় যাবার আগে ভ্যানগাড়ির ড্রাইভারকে আর খুঁজতে হয় না। কাপড়গুলো ধরাধরি করে ভ্যানগাড়িতে নিয়ে ওঠালাম। কানাই মহল্লায় চলে গেল, আমি আজও সেদিনের মতো একা হয়ে গেলাম। একা একাই বাঘা যতীন এলাকাটা একটু ঘোরাঘুরি করলাম। দুপুরের আগেই বাসায় গেলাম, স্নান করার জন্য। এ ছাড়াও আরও একটা উদ্দেশ্য ছিল তাড়াতাড়ি বাসায় ফেরার। উদ্দেশ্য হলো, এখানে আসার পর বাড়িওয়ালার ঘরে কোনও দুপুরে খাওয়া হয়নি, তাই। খেয়েছি হয়ত দু’একদিন সকালে।

স্নান করার জন্য পলির কাছ থেকে সাবান চেয়ে নিলাম। গেলাম লেকে, স্নান করে এলাম বাসায়। কানাইর দু’বোন আগেই বাড়িওয়ালীকে বলে রেখেছে যে, নিতাইদা আজ দুপুরবেলা ভাত খাবে। স্নান করে বাসায় গিয়েই দেখি পলি বসে আছে আমার অপেক্ষায়।
জিজ্ঞেস করলাম, কি রে, তুই এখানে বসে আছিস কেন?
পলি বলল, ‘দাদা, এখানে এসেছ পর্যন্ত একটা দুপুরেও আমাদের সাথে বসে খাওনি। আজ আমি আর ডলি আগেই বাড়িওয়ালী কাকীকে বলে রেখেছি নিতাইদা দুপুরে খাবে। এখন আমার সাথে আস, সবাই একসাথে বসে খাবো।’
পলির কথা শুনে মনে মনে হাসলাম, রক্তের সম্পর্ক নেই_তবু মায়া। বসে আছে একসাথে খাবে বলে।
ও কে বললাম, তুই যা_আমি জামাকাপড় পাল্টায়ে এক্ষুণি আসছি।
পলি চলে গেল বাড়িওয়ালার ঘরে, আমি জামাকাপড় পাল্টায়ে গেলাম খেতে। ডলি, পলি আর বাড়িওয়ালার মেয়েটা ভাতের থাল সামনে রেখে বসে আছে_আমার অপেক্ষায়। আমাকে দেখেই পলি বলছে, ‘এইতো দাদা এসে গেছে, বসেন দাদা বসেন।’
বসলাম ওদের একপাশে ঠিক চোরের মতন চুপ করে। ভাত মেখে খাচ্ছি, হঠাৎ করে বাড়িওয়ালী কাকী আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘বাবা তুমি তোমার বোনের বাড়ি কবে যাচ্ছ?’
আমি থতমত খেয়ে বললাম, কাকীমা কানাইর সাথে কথা হয়েছে দুএক দিনের মধ্যেই যাবো।
কাকীমা বললেন, ‘দেখ সেখানে গিয়ে কিছু করতে পার কি-না।’
বললাম, হ্যাঁ কাকীমা, দেখি সেখানে যাওয়ার পর সবকিছু বুঝা যাবে।
লজ্জায়-লজ্জায় কোনওরকমে খাওয়াদাওয়া শেষ করে ঘর থেকে বাইর হলাম। বাড়িওয়ালির কথা শুনে আমার বেশি ভালো লাগেনি। কেন না, এই ক’দিনে ভারতের হিসাব-কিতাব আমার জানা হয়ে গেছে, তাই। তারা পারে না, জোর করেই একটা অতিথিকে তাড়িয়ে দিতে। যদি সম্ভব হতো, তা হলে তা-ই করতো।
নিজের কাছে নিজেকে খুবই ছোট মনে হচ্ছে! কিছুই করতে পারছি না। পারলে এখনই বাঘা যতীন ত্যাগ করতাম। কিন্তু না, তা আর হচ্ছে না। মন খারাপ করেই কানাইর বাসায় এসে শুয়ে পড়লাম।

কানাই যে, কখন এলো তা আর আমি টের পাইনি। ও মহল্লা থেকে এসে হাত-মুখ দুয়ে আমাকে ঘুম থেকে জাগাল।
জিজ্ঞেস করল, কিছু খেয়েছি কি-না। আমি বললাম, খেয়েছি।
তখন সন্ধ্যা ঘোর হয়ে রাতের পালা।
কানাই বলল, ‘চল ঘুরে আসি।’
আমি জিজ্ঞেস করলাম, কোথায় যাবি?
কানাই বলল, ‘ধর্মতলা যাবো জলপাইগুড়ির একটা টিকেটের জন্য।’
বুঝলাম আগামীকালই আমি বাঘা যতীন ত্যাগ করছি।

চলবে…