ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

পূর্বের লেখা (পর্ব-১১)

পর্ব-১২:

পরদিন সকাল বেলা বড়দি আমাকে ঘুম থেকে জাগালো। বেলা তখন সকাল দশটার মতো বাজে। ভাড়াটিয়া ছেলে দুটোও নেই। ওরা সকাল আটটার সাথে সাথেই ওদের কাজে চলে যায়। ওরা সেখানে একটা পাওয়ার স্টেশনে কাজ করে। দিদি আমাকে জিজ্ঞেস করলো, “ওখানেও কি তুই এতো দেরি করে ঘুম থেকে উঠিস?” বললাম, “না। অনেক রাতে ঘুমিয়েছি তো, তাই ঘুম ভাঙছিলো না “ তাড়াতাড়ি করে উঠে স্নানঘর থেকে হাত-মুখ ধুলাম। এরপর চা-বিস্কুট খেয়ে বের হলাম, উদ্দেশ্য ভুটান। বাংলাদেশ থাকতে ভুটানের নাম শুনেছি, কিন্তু কখনো চোখে দেখা হয়নি। এখন আমি ভুটানের সামনে। পুরো ভুটান ঘুরে দেখার সৌভাগ্য না হলেও, ভুটানের আশপাশ ঘুরে দেখার সুযোগ হাতছাড়া করতে চাই না। ভুটান আমাকে যেতেই হবে, দেখতেই হবে।

দিদির বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলাম গ্যারেজ লাইনে। গ্যারেজ লাইন বড়দির বাড়ির উত্তর দিকে, আসাম-মিজোরাম মেইন রোড। সেখানে ছোট ভাগিনার পান-বিড়ি-সিগারেটের দোকান। বড় ভাগিনা ও মেজো ভাগিনার গাড়ি মেরামত করার গ্যারেজ। বড় ভাগিনার নিজের গ্যারেজ, আর মেজো ভাগিনা পরের গ্যারেজে কাজ করে।

গেলাম ছোট ভাগিনার দোকানে। ছোট ভাগিনার কাছ থেকে ভুটান যাবার দিকনির্দেশনা নিলাম। কীভাবে যাবো, আর কোথায় যাবো। ছোট ভাগিনা আমাকে ভুটান যেতে বারণ করলো। বললো, তুমি এখানে নতুন এসেছ, ভাষা জানার দরকার আছে। আমি ছোট ভাগিনার কথা শুনলাম না। ওর কথাও আমার তেমন ভালো লাগলো না। আমি ভুটান যাবোই যাবো। এই হলো আমার মনের কথা। কিন্তু মনের কথাটি ভাগিনার কছে আর প্রকাশ করলাম না। মনের কথা মনেই রেখে দিলাম। বাংলাদেশ থেকে ভারত এসেছি বিনা পাসপোর্টে। আর এখন ভুটানতো চোখের সামনেই। না গেলে আর হয় না, যেতেই হবে।

বীরপাড়া থেকে ভুটান গুমটু ভারতীয় তিন টাকা ভাড়া। দূরত্ব পাঁচ কিলোমিটার মাত্র। সাথে টাকা আছে চারশো টাকার মতো। এই চারশো টাকা ভারতের জন্য অনেক কিছু। চারশো টাকা শেষ হতে আরও কয়েকদিন সময় লাগবে। তাই নিজের পকেটে টাকা থাকতে থাকতেই আমাকে ভুটান দেখতে হবে। ছোট ভাগিনার কাছ থেকে এক প্যাকেট সিগারেট চেয়ে নিলাম। গেলাম বীরপাড়া বাজার গুমটু জিপ স্ট্যান্ডে। স্ট্যান্ডের সামনেই চায়ের দোকান। দোকানে গিয়ে বসলাম। দোকানদারকে চায়ের অর্ডার দিলাম। দোকানদার চা বানিয়ে সামনে এনে দিলো। চা পান করছি, আর এদিক-ওদিক চেয়ে চেয়ে দেখছি। ভুটান থেকে জিপে করে ভুটানিরা আসছে। ভুটানিদের হাট-বাজার বলতে এই বীরপাড়া বাজারই একমাত্র বাজার। ওরা সাথে করে বিক্রি করার জন্য নানারকম ফল-ফলারি নিয়ে আসে। কেউ নিয়ে আসে শুকনো লাকড়িও। ওগুলো ওরা বীরপাড়া বাজারে বিক্রি করে। তারপর ওরা ওদের নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি কিনে নিয়ে যায়। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ দেখলাম। ভুটান যাবো কি না ভাবছি। মনে খুব ভয়ও লাগছে। ভয় লাগছে শুধু ভাষা না জানার কারণে।

মনের ভেতর ভয় থাকা সত্ত্বেও থামলাম না। এগিয়ে গেলাম জিপ গাড়ির সামনে। জিপের হেলপার আমাকে একরকম জোর করেই জিপে টেনে উঠালো। ওরা বাংলা, হিন্দি, নেপালি, মাদ্রাজি, গুজরাটি, মারাঠি ভাষা সবই জানে। যার সাথে যেই ভাষার প্রয়োজন, তা-ই ব্যবহার করে। প্রত্যেক জিপে ১০ জন করে যাত্রী বহন করে। যেই জিপে করে যাচ্ছিলাম সেই জিপে আমি সহ যাত্রী হলাম সাত জন। পাঁচজন ভুটানি মহিলা। আর একজন পুরুষ যাত্রী। তিনি বীরপাড়ার বাসিন্দা, যাবেন মাকড়া পাড়া কালীমন্দিরে।

মাকড়া পাড়া হলো ভারত-ভুটান বর্ডার এলাকার জায়গার নাম। মাকড়া পাড়া ভারতের। আর ভুটানের হলো গুমটু। প্রতিদিন বীরপাড়ার আশপাশ থেকে অনেক মানুষ মাকড়া পাড়া কালীমন্দিরে পূজা দিতে যায়। এই ভদ্রলোকটিও মাকড়া পাড়া পূজা দিতেই যাচ্ছে। জিপে বসে লোকটি শুধু আমার দিকেই বেশি তাকাচ্ছে। লোকটার হাতে কয়েক রকম ফল-ফুল, আর একটা ঝুড়ি। তিনি আমাকে কি যেন বলবে বলবে ভাব, অথচ বলছে না।

জীপগাড়ি চলছে উঁচুনিচু পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে। রাস্তার দুই পাশে বন-জঙ্গল। মাঝেমধ্যে চা বাগান। এর ফাঁকে ফাঁকে নেপালি শরণার্থীদের ঘরবাড়ি। নেপালিরা ভারত সীমান্তবর্তী এলাকায় শরণার্থী হয়েই থাকে। ওদের কোনও ভারতীয় নাগরিকত্ব নেই। যেই রাস্তা দিয়ে জিপ গাড়ি চলছে, সেই রাস্তার দু-পাশেই গহীন বন-জঙ্গল। সেই বনে বন্য হাতিও আছে। ওই হাতিগুলো দল বেধে চলে। এক বন থেকে আরেক বনে যাবার সময় রাস্তা পার হয়ে যেতে হয়। তখন যানবাহনগুলো দূরে গাড়ি থামিয়ে রাখে। কারণ, সময় সময় গাড়ির শব্দে বন্য হাতিগুলো ক্ষেপে যায়। আর ক্ষেপে গেলেই ঘটে বিপদ।

রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলা পথচারীরা কখনো কখনো এসব বন্যহাতির কবলে পড়ে আহত এমনকি নিহতও হয়। তাই বীরপাড়া টু ঘুমটু রোডে চলাচলকারী যানবাহনের ড্রাইভাররাও দেখেশুনে গাড়ি চালায়। যাতে কোন প্রকার দুর্ঘটনা না ঘটে। বীরপাড়া থেকে ভুটান গুমটু যেতে সময় লাগে মাত্র ৩০ মিনিট। পাহাড়ি উঁচু নিচু রাস্তা দিয়ে একসময় পৌঁছে গেলাম গুমটু।

জীপ থেকে নামার সাথে পুরুষ লোকটি আমাকে জিজ্ঞেস করলো, “আপনার বাড়ি কোথায়? কোথায় এসেছেন? কার বাড়ি? কোথায় যাবেন? কেন যাবেন? ইত্যাদি ইত্যাদি।” লোকটির জিজ্ঞেস করা প্রতিটি কথারই জবাব দিয়েছি। লোকটি আমার বড়দির বাড়ির পাশের বাড়ির লোক। লোকটার হাতে সময় নেই। নাহলে লোকটি আমাকে সাথে করে নিয়ে যেতেন ভুটানের ভেতরে। জীপের হেলপারকে ডেকে বললেন, “এই লোকটাকে একটি ভুটানের ভেতরে নিয়ে যাবে। তিনি আমাদের অতিথি। বাংলাদেশ থেকে এসেছে। ভুটান দেখার খুব শখ তাই এখানে এসেছে।”

ড্রাইভার-হেলপার দুইজনেই বলল, “ভুটানের ভেতরে যেতে কারোরই পারমিশন লাগে না। উনিও যাবে সমস্যা নেই। আপনি নিশ্চিত থাকুন।” বীরপাড়া থেকে আসা সব যাত্রীদের ভাড়া আদায় করা হলো। তারপর ড্রাইভার-হেলপার দুইজন আমাকে সাথে নিয়ে ভুটাবের ভেতরে প্রবেশ করলো। ভারত-ভুটান কাঁটাতারের বেড়ার মাঝখানে সুবিশাল একটা গেইট। চেকপোস্ট আছে। দুইজন করে ভুটানি সীমান্ত রক্ষীবাহিনী থাকে। কে আসলো, কে গেলো তার দিকে তাদের নজর নেই। নজর পড়ে তখন, যখন একটা গাড়ি ভেতরে বা বাইরে যাবে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত গেইট জনসাধারণের জন্য খোলা থাকে। রাতের বেলা বিশেষ কোনও জরুরি কাজে ভেতর-বাইরে যেতে পারমিশন প্রয়োজন হয়।

জিপ গাড়ির চালকের সাথে যখন সীমান্ত গেইট পাড় হচ্ছিলাম, ভয়ে তখন আমার শরীর কাঁপতে লাগলো। যদি সীমান্তরক্ষী আমাকে ডাক দেয়, আর যদি পাসপোর্ট চায়, যদি আটকিয়ে রাখে? এসব কারণে আমার ভয় লাগছিল। কিন্তু না, ওরা আমাদের দিকে একটু ফিরেও তাকায়নি। আরামে চলে গেলাম ভুটান গুমটুর ভেতরে। কী সুন্দর জায়গা! মন চায় রাস্তার মাঝখানে শুয়ে থাকি। খুবই পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন জায়গা। গাছের একটা শুকনো পাতা ঝরে পড়ার সাথে সাথে, সেটা কুড়িয়ে ডাস্টবিনে জমা করে রাখে।

শীতের দেশ ভুটান। ভুটানিরা বারো মাস একরকম গরম জামা-কাপড় ব্যবহার করে। বারো মাসই ভুটানের আবহাওয়া একরকম থাকে। তবে বৃষ্টির কোনও মৌসুম না থাকলেও মাঝেমধ্যে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। বৃষ্টিতে ওরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। কারণ, পাহাড়ি জমিগুলো পানির জন্য সবসময় খাঁ খাঁ করে তাই। ওরা বছরে দুই-একবার গোসল করে। ভুটানের বেশিরভাগ মানুষেই মদ্যপায়ী। মদপান শুধু শরীর গরম রাখার একটা পন্থা।

ভুটানের গুমটুতে একটা সিমেন্ট ফ্যাক্টরি আছে। সেটা ভারত-ভুটানের যৌথভাবে নির্মাণ করা। বিশাল জায়গা নিয়ে এই সিমেন্ট ফ্যাক্টরি। গুমটুতে পাথরের অভাব নেই। গুমটুর আশেপাশে যতোগুলো পাহাড় আছে, সব পাহাড়ই পাথরের পাহাড়। পাথর নাকি এসব পাহাড়ে জন্ম হয়। সামান্য বৃষ্টিপাতে পাহাড় ধ্বসে অনেক অনেক পাথর বের হয়। ঐ পাথরগুলোই সিমেন্ট ফ্যাক্টরির কাজে লাগায়। গুমটুতে সপ্তাহে একদিন হাট বসে। এটা গুমটু এলাকাবাসীর স্থানীয় সাপ্তাহিক হাট। ওই হাটে বীরপাড়ার অনেক ব্যবসায়ীও অনেকরকম পণ্যসামগ্রী বিক্রি করে। একটা সিনেমাহলও আছে। সিনেমাহলটির নাম, ‘ঔঁ’ (ওম) সিনেমা। ভারতীয় ছায়াছবি বেশি চলে। ভুটানের নিজস্ব চলচ্চিত্রও আছে। তবে ওরা ভারতীয় চলচ্চিত্রই বেশি পছন্দ করে থাকে। গুমটুতে একটা বৌদ্ধমন্দির আছে। মন্দিরটি একটা পাহাড়ের চূড়ায়। অনেক উঁচু পাহাড়। তবে মন্দিরে ট্যাক্সি বা অন্য গাড়ি চড়েও পৌঁছানো যায়।

পুরো পাহাড়টা তিনটে প্যাঁচ দিয়ে রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। পায়ে হেঁটে মন্দিরে উঠতে অনেক সয়ম লাগে বলেই, এরকমভাবে রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। ভুটানের ভেতরে গুমটু এলাকায় একা-একাই ঘুরেফিরে দেখতে লাগলাম। বৌদ্ধমন্দিরটাও দেখলাম। বৌদ্ধমন্দিরের উপর থেকে এদিক-ওদিক তাকালেই চোখে পড়ে অসংখ্য পাহাড়। কোনও সড়ক মহাসড়ক দেখলাম না। এখানকার অধিবাসীরা দূর-দূরান্তের দুর্গম পাহাড়ি পথ পাড়ি দেয় গাধার সাহায্য নিয়ে। ওইসব পাহাড়ি এলাকায় মালামাল বহন করা হয় একমাত্র গাধা দিয়েই। গাধাই ওদের মালামাল বহনের একমাত্র বাহন। বৌদ্ধমন্দির থেকে যখন দূরে দৃষ্টি গেলো, তখন মনটা চাচ্ছিল, চলে যাই অজানার দেশে। কিন্তু যাওয়া আর হলো না। নিজের সন্তানাদির কথা মনে পড়ে গেল তাই। এসব ভাবতে ভাবতে অনেক সময় পার করে দিলাম, এবার ফেরার পালা। সময় সকাল পেরিয়ে দুপুর হতে লাগলো। তবু গুমটু ছেড়ে আসতে মন চাচ্ছিল না। মন চাইছে থেকে যেতে।

সেখানে আমি যে এতক্ষণ সময় ধরে ঘোরাফেরা করলাম, কেউ আমাকে কিছুই বলেনি। কেউ কিছু জিজ্ঞেসও করেনি। বৌদ্ধমন্দির থেকে পায়ে হেঁটে নিচে নামলাম। আবার গেলাম গুমটু টাউনে। আসলে এটা টাউন নয়। কিন্তু ভুটানিদের কাছে এটা তাদের খুব পছন্দের একটা মিনি টাউন। অনেক ভুটানি গুমটুকে গুমটু টাউনও বলে। ‘ঔঁ’ সিনেমাহলের সামনে একটা হোটেল আছে। খুবই পরিপাটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। সেই হোটেলে ভাত-মাছ সহ চা বিস্কুটও পাওয়া যায়। জনশূন্য এলাকা হলেও, রাত ৮টা পর্যন্ত এই হোটেলটি খোলা থাকে। সিমেন্ট ফ্যাক্টরির শ্রমিকরা এই হোটেলেই বেশি সময় কাটায়। চা পান করে, দুপুরবেলার খাওয়া-দাওয়া সারে। কেউ কেউ রাতের খাওয়াও সেরে নেয়। হোটেলে তিন-চারজন কর্মচারী আছে। সব কর্মচারীই ভুটানি মেয়ে। হোটেলের সামনে সারিবদ্ধভাবে চেয়ার বিছানো আছে। সামনে গিয়ে একটা চেয়ারে বসলাম।

একটি মেয়ে আমার সামনে এসে জিজ্ঞেস করলো, ‘কী খাবেন?'(ওরা সবাই বাংলা জানে। কারণ, ওদের বেশি আনাগোনাই ভারতের ভেতরকার এলাকায়। হোটেলের যাবতীয় মালামাল নিকটবর্তী বীরপাড়া বাজার থেকেই সংগ্রহ করে। আর সারাদিন যা বিক্রি হয়, তা ভারতের মানুষের কাছেই বিক্রি করা হয়। তাই ঘুমটুবাসী হিন্দি বা বাংলা ভাষাকে খুবই গুরুত্ব দেয়)। মেয়েটিকে বললাম, দুটো বিস্কুট আর এক কাপ চা দিন। একটা প্লেটে করে দুটো বিস্কুট এনে দিলো, সাথে এক গ্লাস পানি। একটু পরে চা-ও এনে দিলো। চা পান করে জিজ্ঞেস করলাম, কত হয়েছে? বললো ২টাকা ৬০পয়সা। চা বিস্কুটের দাম দিয়ে চলে এলাম ভারতের ভেতরে। সময় দুপুর পেরিয়ে বিকাল বেলার শুভাগমন ঘটছে। একটা জিপগাড়ি আছে। ড্রাইভার হেলপার গুমটুর ভেতরে। হয়তো দুপুরের খাবার খেতে গিয়েছে। কখন আসবে, আর কখন গাড়ি ছাড়বে কাউকে জিজ্ঞেসও করতে পারছি না। জিপ গাড়ির সামনে-পিছনে কোনও মানুষই নেই। এমনিতে জনশূন্য এলাকা, আবার দুপুরবেলা। মানুষ নাই বললেই চলে। অনেকক্ষণ এদিক-ওদিক ঘোরা-ফেরা করতে করতে ড্রাইভার হেলপারের দেখা মেললো।

সীমান্ত ঘেঁষা ভারতের ভেতরে কোনও দোকানপাট নেই। আছে বনজঙ্গল আর চা বাগান। কোনকিছুর জন্য অপেক্ষা করতে হলে দাঁড়িয়ে থেকেই অপেক্ষা করতে হবে। না হয় মাকড়া পাড়া কালীমন্দিরে গিয়ে সময় কাটাতে হবে। ড্রাইভার হেলপার জীপের সামনে এসে আবার রওয়ানা দিলো, মাকড়া পাড়া কালীমন্দিরের দিকে। হয়তো ওরা যাচ্ছে যাত্রীর খোঁজে। ওদের যাওয়া দেখে আমিও পেছন পেছন হাঁটা আরম্ভ করলাম। কালীমন্দিরটিও একটা পাহাড়ের চূড়ায়। খুবই সুন্দর! অনেক বড় জায়গা নিয়ে মন্দিরটি স্থাপিত হয়েছে। কেবা কারা এই উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় মন্দিরটি তৈরি করেছে, তা জানা হয়নি। এ-বিষয়ে কাউকে জিজ্ঞাসাও করিনি। জীপ চালক আর হেলপারের সাথেই অনেকক্ষণ ঘুরে-ফিরে চলে এলাম জীপগাড়ির সামনে। যাত্রী নেই। বীরপাড়ায় ওদেরও হয়তো জরুরি কাজ আছে। তাই ওরা আমাকে নিয়েই গাড়ি ছেড়ে দিলো। আসলাম বীরপাড়া।

ভাড়া দিয়ে একটা রিকশা নিয়ে চলে আসলাম দিদির বাড়ি। ওখানে সহজে কেউ রিকশায় চড়ে না। অযথা কেউ একটি কানাকড়িও খরচ করে না। বীরপাড়া থেকে আমার বড়দির বাড়ি পায়ে হেঁটে যেতে সময় লাগে মাত্র ১০ মিনিট। এই ১০ মিনিটের পথ অতিক্রম করতে আমি রিকশায় চড়েছি। এটা সেখানে খুবই ভাবার বিষয়। তবু আমি রিকশায় চড়েই যাচ্ছি।

সময় তখন প্রায় বিকাল তিনটার মতো হবে। আমার জন্য দিদি খুব চিন্তায় ছিলো। বাড়ির সামনে রিকশার ট্রিং ট্রিং শব্দ শুনে দিদি বাড়ির গেইটে আসলো। গেইট খুলেই দেখে আমি রিকশাওয়ালাকে ভাড়া দিচ্ছি। বড়দির দু-চোখ বড় বড় হয়ে গেলো। যেখানকার মানুষ প্রয়োজন ছাড়া একটা কানাকড়িও খরচ করে না, সেখানে আমি রিকশায় চড়ে ঘোরা-ফেরা করছি? এটাতো আমার দিদির কাছে একরকম ভাবনার বিষয়ই! রিকশাওয়ালাকে একটা ১০টাকার নোট হাতে দিয়ে বললাম, আপনার ভাড়া রাখুন। রিকশাওয়ালা ১০টাকার নোটখানা রেখে আমাকে ৫ টাকা ফেরত দিলো। বড়দি একরকম রিকশাওয়ালার উপর ক্ষেপেই গেল। রিকশাওয়ালাকে বললো, “এই ও কোত্থেকে এসেছে শুনি? পাঁচ টাকা রেখে দিলে যে? টাকা কি গাছে ধরে?’ দিদির কথা শুনে রিকশাওয়ালা থতমত খেয়ে আমাকে আরও দুই টাকা ফেরত দিতে চাইলো। আমি বললাম, থাক এই দুই টাকা আর আমাকে দিতে হবে না, তুমি কাকা চা বিস্কুট খেয়ে নিও। আমার কথা শুনে বড়দি রাগ করে বাড়ির ভেতরে চলে গেল। আমিও বড়দির পেছনে পেছনে বাড়ির ভেতরে গেলাম। মনে মনে ভাবতে লাগলাম, আজ হয়তো আমার খবর আছে! রিকশাওয়ালাকে দুই টাকা বেশি দেওয়ার ফল হয়তো বের হবে। দেখি ঘরে গিয়ে বড়দি কী বলে?

চলবে…